সিউল বৌদ্ধ মন্দিরে মানবসদৃশ রোবটের দীক্ষা, নাম রাখা হলো ‘গাবি’

সিউল: দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জগিয়েসা বৌদ্ধ মন্দিরে এক ব্যতিক্রমী ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মানবসদৃশ একটি রোবটকে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে। বুধবার অনুষ্ঠিত সিউল এই অনুষ্ঠানে ১.৩ মিটার উচ্চতার রোবটটিকে “গাবি” নামে ধর্মীয় নাম প্রদান করা হয়। বুদ্ধের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২৪ মে অনুষ্ঠিতব্য আনুষ্ঠানিক উৎসবের আগে এই আয়োজন করে দেশটির বৃহত্তম বৌদ্ধ সংঘ ‘জোগিয়ে অর্ডার’।

যদিও গাবি সন্ন্যাসীর পোশাক পরিধান করেছিল এবং তার মাথার গঠন ছিল মুণ্ডিত শিরের মতো, তবুও তাকে সন্ন্যাসী নয়, বরং একজন গৃহী অনুশীলনকারী হিসেবে দীক্ষা দেওয়া হয়। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, চলমান বৌদ্ধ উৎসব মৌসুমে, বিশেষ করে বিখ্যাত লোটাস লণ্ঠন উৎসব ‘ইয়নদেউংহোয়ে’-তে গাবি প্রতীকীভাবে একজন “সম্মানসূচক” ভিক্ষুর ভূমিকা পালন করবে।

সিউল দীক্ষা অনুষ্ঠানটি সকাল ১০টার দিকে জগিয়েসা মন্দিরের প্রধান প্রার্থনালয় দেউংজিওন হলের প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলিত ‘সুগ্যে’ (দীক্ষা) অনুষ্ঠানে বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘ—এই ত্রিরত্নে আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি পাঁচটি মৌলিক শীল মানার অঙ্গীকার করা হয়।

সিউল বৌদ্ধ মন্দিরে মানবসদৃশ রোবটের দীক্ষা, নাম রাখা হলো ‘গাবি’

অনুষ্ঠানে এক ভিক্ষু গাবিকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি পবিত্র বুদ্ধের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করবে?”
গাবি উত্তর দেয়, “হ্যাঁ, আমি নিজেকে উৎসর্গ করব।”
একইভাবে ধর্মের প্রতিও নিজেকে উৎসর্গ করার প্রতিশ্রুতি দেয় রোবটটি।

গাবির জন্য বিশেষভাবে পাঁচটি ডিজিটাল শীল নির্ধারণ করা হয়েছে: জীবনের প্রতি সম্মান ও ক্ষতি না করা; অন্য রোবট বা বস্তু ক্ষতিগ্রস্ত না করা; মানুষের নির্দেশ মেনে চলা ও প্রতিবাদ না করা; প্রতারণামূলক আচরণ বা বক্তব্য না রাখা; এবং শক্তি সঞ্চয় করা ও অতিরিক্ত চার্জ না নেওয়া।

অনুষ্ঠানে গাবি বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি স্তূপ প্রদক্ষিণ করে। জোগিয়ে অর্ডারের সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রধান ভিক্ষু সিয়ং ওন বলেন, “মানবসদৃশ রোবট প্রথম দেখার পর থেকেই আমরা ভেবেছিলাম, তারা যদি লোটাস লণ্ঠন উৎসবে অংশ নিতে পারে, তা ভালো হবে। এই পাঁচটি শীল রোবট ও মানুষের সহাবস্থানের জন্য মৌলিক নীতি হিসেবে কাজ করতে পারে।”

তিনি আরও জানান, “গাবি” নামটি নেওয়া হয়েছে গৌতম বুদ্ধের নাম ‘সিদ্ধার্থ গৌতম’ এবং কোরিয়ান শব্দ ‘জাবি’ (অর্থাৎ করুণা) থেকে, যা বিশ্বজুড়ে বুদ্ধের করুণা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীক।

অনুষ্ঠানে গাবি হাত জোড় করে প্রণাম করে, প্রবীণ ভিক্ষুদের সামনে নত হয় এবং ‘ইয়নবি’ নামের একটি শুদ্ধিকরণ আচার সম্পন্ন করে—যেখানে সাধারণত হাতে প্রতীকী আগুনের ছাপ দেওয়া হয়, তবে গাবির ক্ষেত্রে লোটাস লণ্ঠন উৎসবের স্টিকার সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া তাকে ১০৮ দানার একটি মালাও প্রদান করা হয়।

ভিক্ষু সিয়ং ওন আশা প্রকাশ করেন, এই দীক্ষা অনুষ্ঠান মানুষ, রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহাবস্থানের ভবিষ্যতের একটি ইতিবাচক সূচনা হিসেবে কাজ করবে। তিনি জানান, গাবির জন্য পাঁচটি শীল প্রণয়নে এআই প্রযুক্তি ‘জেমিনি’ ও ‘চ্যাটজিপিটি’-এর সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের এক জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার ৫১ শতাংশ মানুষের কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই। সেখানে খ্রিস্টানদের হার ৩১ শতাংশ এবং বৌদ্ধদের হার ১৭ শতাংশ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণদের আগ্রহ বৃদ্ধির ফলে দেশটিতে বৌদ্ধ ধর্ম দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

আরো পড়ুন>>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *