প্রখ্যাত মার্কিন বৌদ্ধ পণ্ডিত ও সমাজকর্মী রবার্ট থারম্যান আর নেই

পাশ্চাত্যে বৌদ্ধধর্মের আলো ছড়ানো প্রখ্যাত মার্কিন বৌদ্ধ পণ্ডিত, অনুবাদক ও সমাজকর্মী অধ্যাপক রবার্ট এ. এফ. থারম্যান আর নেই। গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) নিউ ইয়র্কের উডস্টকে নিজ বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রবার্ট থারম্যান। মৃত্যুকালে ধর্মপ্রাণ ও জ্ঞানতপস্বী এই সাধকের বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ‘ইন্দো-তিব্বতিয়ান বুড্ডিস্ট স্টাডিজ’-এর সম্মানিত অধ্যাপক এবং নিউ ইয়র্ক সিটির ‘তিব্বত হাউস ইউএস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছিলেন। তিব্বতি বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহের গভীর ও নিখুঁত অনুবাদ এবং মূল ভাবার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বুদ্ধের বাণীকে আধুনিক বিশ্বের কাছে সহজবোধ্য করার নিরলস প্রচেষ্টার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

রবার্ট থারম্যান এর মৃত্যু: বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অপূরণীয় ক্ষতি
রবার্ট থারম্যান এর মৃত্যু: বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অপূরণীয় ক্ষতি

রবার্ট থারম্যান: তিব্বত হাউস ইউএস-এর আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ

সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর মহাপ্রয়াণের খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে ‘তিব্বত হাউস ইউএস’। এক শোকবার্তায় তারা জানায়: “আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, বিশিষ্ট মার্কিন বৌদ্ধ পণ্ডিত, তিব্বত হাউস ইউএস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা, লেখক এবং অনুবাদক রবার্ট এ. এফ. থারম্যান মঙ্গলবার সকালে নিউ ইয়র্কের উডস্টকে মারা গেছেন। তাঁর শিক্ষা ও প্রজ্ঞা অসংখ্য মানুষের জীবনকে আলোড়িত করেছে। ওম মণি পদ্মে হুম।” থারম্যানের পরিবার এই শোকের মুহূর্তে সবার কাছে একান্ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।

রবার্ট থারম্যান এর মৃত্যু: বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অপূরণীয় ক্ষতি

অধ্যাপক থারম্যানের প্রস্থানে বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ পণ্ডিত, ভিক্ষুসংঘ এবং অনুসারীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রখ্যাত তিব্বতি বৌদ্ধ গুরু এবং জংচেন সাধক চোকি ন্যিমা রিনপোচে এক বিবৃতিতে বলেন: “বব থারম্যান ছিলেন একজন সত্যিকারের পণ্ডিত ও সাধক, যিনি সদ্ধর্ম এবং জগতের সকল প্রাণীর কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর এই প্রস্থান আমাদের সমগ্র বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা পরম শ্রদ্ধার সাথে তাঁর নির্বাণ যাত্রার জন্য প্রার্থনা করছি।”

তিব্বতি অনুবাদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘লোতসাওয়া হাউস’ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছে, তিব্বতি ভাষায় একটি শব্দ আছে—’শিং র্তা ছেন পো’ (ཤིང་རྟ་ཆེན་པོ་), যার অর্থ ‘মহাপথপ্রদর্শক’ বা ‘চ্যাম্পিয়ন’। অধ্যাপক থারম্যান নিজেই ছিলেন পাশ্চাত্যে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের একজন মহান পথপ্রদর্শক ও চ্যাম্পিয়ন।

দলাই লামার সান্নিধ্য ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

১৯৪১ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করা রবার্ট থারম্যান ফিলিপস এক্সটার এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে পরমপাবন চতুর্দশ দলাই লামার ব্যক্তিগত ছাত্র হিসেবে তিব্বত ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম নিয়ে গভীর গবেষণা ও সাধনা করেন। তিব্বতি কাঙ্গিউর থেকে বিখ্যাত ‘বিমলকীর্তি সূত্র’ ইংরেজিতে অনুবাদসহ বৌদ্ধ দর্শনের ওপর তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন।

পরমপাবন দলাই লামার নির্দেশনায় ও অনুপ্রেরণায় ১৯৮৭ সালে বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা রিচার্ড গিয়ার এবং সুরকার ফিলিপ গ্লাসের সাথে যৌথভাবে তিনি নিউ ইয়র্কে অলাভজনক সংস্থা ‘তিব্বত হাউস ইউএস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি তিব্বতের অনন্য সাংস্কৃতিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশ্বব্যাপী এক বিশাল নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

  • টাইম ম্যাগাজিন: ১৯৯৭ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে আমেরিকার ২৫ জন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন হিসেবে ঘোষণা করে।
  • লাইট অফ ট্রুথ অ্যাওয়ার্ড: ২০০৩ সালে তিব্বতের মানবাধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনে অনন্য অবদানের জন্য তিনি ‘লাইট অফ ট্রুথ’ পুরস্কারে ভূষিত হন।
  • কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি: ২০১৯ সালে অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ধর্ম বিভাগে ‘জে তসং খাপা’ অধ্যাপক (পাশ্চাত্যে বৌদ্ধ গবেষণার প্রথম কোনো স্থায়ী আসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০১ সালে আধুনিক বিশ্বের সংকট ও সহিংসতা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক থারম্যান বলেছিলেন: “বৌদ্ধ দর্শন আমাদের শেখায় যে সহিংসতা কখনো কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। এটি আমাদের ভেতরের দারিদ্র্য, আদর্শিক বিভ্রান্তি এবং কুসংস্কারের মতো গভীর সমস্যাগুলোর মূল উৎপাটন করতে এবং পরম করুণার পথ বেছে নিতে উৎসাহিত করে।”

মহাপ্রয়াণকালে তিনি স্ত্রী বিরগিট ক্যারোলিন “নেনা”, পাঁচ সন্তান (ডেকেন, গ্যান্ডেন, মিপাম, তায়া ও বিখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী উমা থারম্যান) এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি গুণগ্রাহী ও অনুসারী রেখে গেছেন। সমবেদনা ও শ্রদ্ধায় বিশ্ব বৌদ্ধ সমাজ আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি নতজানু।

আরো পড়ুন>>: প্রখ্যাত মার্কিন বৌদ্ধ পণ্ডিত ও সমাজকর্মী রবার্ট থারম্যান আর নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *