নয়াদিল্লি: শান্তিপদযাত্রা (Walk for Peace) পরিচালনার উদ্দেশ্যে একদল ভিক্ষু ও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় সেলিব্রিটি কুকুর ‘আলোকা’কে সাথে নিয়ে ভারতে এসে পৌঁছেছেন বিশ্বখ্যাত ভিয়েতনামিজ-আমেরিকান থেরবাদ বৌদ্ধ ভিক্ষু ভেনারেবল পান্নাকারা থেরা (যিনি ‘সু তুয়ে নান’ নামেও পরিচিত)। আমেরিকা ও শ্রীলঙ্কায় সফল সফর শেষ করে নেপাল ও ভারতে এই নতুন আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু করতে আজ থাইল্যান্ড হয়ে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারা। দিল্লিতে বৌদ্ধ নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ ও ধম্ম আলোচনার পর শীঘ্রই তাদের এই বিশেষ পদযাত্রাটি শুরু হতে যাচ্ছে।
বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ৪ প্রধান তীর্থক্ষেত্রে হবে এই শান্তিপদযাত্রা
বিশ্বে শান্তি, সচেতনতা ও মৈত্রীর বার্তা ছড়িয়ে দিতে ভিক্ষু সংঘের এই নতুন আধ্যাত্মিক পথচলা শুরু হতে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই পদযাত্রায় তারা ভারত ও নেপালের বুদ্ধের জীবনের সাথে জড়িত অত্যন্ত পবিত্র চারটি প্রধান স্থান পরিদর্শন করবেন:

- লুম্বিনি (নেপাল): সিদ্ধার্থ গৌতমের (বুদ্ধ) জন্মস্থান।
- বুদ্ধগয়া (ভারত): যেখানে বুদ্ধত্ব বা বোধি লাভ করেছিলেন।
- সারনাথ (ভারত): বুদ্ধত্ব লাভের পর যেখানে তিনি প্রথম বাণী প্রচার করেছিলেন।
- কুশিনগর (ভারত): বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের স্থান।
দিল্লিতে অবস্থানকালীন সময়ে ভেনারেবল পান্নাকারা থেরা বিভিন্ন বৌদ্ধ নেতা ও সম্প্রদায়ের সাথে বৈঠক করবেন। ইতিমধ্যেই আজ তিনি ‘মহা বোধি সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’ (MBSI)-র নয়াদিল্লি কেন্দ্রে একটি ধম্ম আলোচনাও (Dhamma talk) পরিচালনা করেছেন।
আকর্ষণের কেন্দ্রে ‘ফুর মঙ্ক’ আলোকা
ভিক্ষুদের এই সফরে বরাবরই সাধারণ মানুষের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে আলোকা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভক্তরা তার প্রতিটি পদক্ষেপের খোঁজ রাখছেন এবং তার সুস্থতা কামনা করছেন। শান্তিপদযাত্রার অফিশিয়াল ফেসবুক গ্রুপে একজন অনুরাগী লিখেছেন: “আমাদের ‘ফুর মঙ্ক’ (Fur Monk) আলোকা আবার ভারতে ফিরে এসেছে, যেখানে ভেনারেবল পান্নাকারার সাথে শান্তিপদযাত্রায় তার এই অসাধারণ পথচলা শুরু হয়েছিল। ধুলোমাখা রাস্তা, শান্ত গ্রাম আর মাইলের পর মাইল সচেতন হাঁটার এই যাত্রায় আলোকা এক বিশ্বস্ত সঙ্গী। তার শান্ত চোখ ও উপস্থিতি লাখো মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। সে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভালোবাসার জন্য কোনো ভাষার প্রয়োজন হয় না।”
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার থেকে বিশ্ব শান্তির দূত
টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের ‘হুওং দাও বিপাসনা ভাবনা সেন্টার’-এর বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট ভেনারেবল পান্নাকারা থেরোর জীবন বেশ অনুপ্রেরণাদায়ী। অতীতে তিনি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। ক্যারিয়ার ত্যাগ করে তিনি সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ দূরত্বের পদযাত্রার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও করুণার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য প্রচারণায় নামেন।
২০২২-২০২৩ সালের যাত্রা: প্রায় ১০০ জন ভিক্ষুকে নিয়ে তিনি নেপাল ও ভারতে ১১২ দিনের এক ধুতঙ্গ (Dhutanga) পদযাত্রা সম্পন্ন করেন, যা ছিল প্রায় ৩,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই যাত্রাপথেই কলকাতা থেকে নেপাল সীমান্তের মাঝে ‘আলোকা’ নামের ওই পথকুকুরটি তাদের সঙ্গী হয়। পরবর্তীতে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দত্তক নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
২০২৫ সালের ঐতিহাসিক আমেরিকা যাত্রা: অক্টোবর ২০২৫-এ ভেনারেবল পান্নাকারা এবং ভিক্ষুদের একটি দল আমেরিকার ১০টি রাজ্যজুড়ে ৩,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক পদযাত্রা শুরু করেন। তুষারঝড় ও তীব্র শীতের মাঝেও খালি পায়ে হেঁটে ১০৮ দিনে তারা এই যাত্রা শেষ করেন ওয়াশিংটন ডিসির লিংকন মেমোরিয়ালে।
২০২৬ সালের শ্রীলঙ্কা সফর: আমেরিকার পর, গত ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে তারা শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক ডাম্বুলা রাজামাহা বিহার থেকে এক সপ্তাহের একটি আন্তর্জাতিক শান্তিপদযাত্রা শুরু করেন এবং ২৯ এপ্রিল সফর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান।
আমেরিকা ও শ্রীলঙ্কার পর এবার ভারত ও নেপালের মাটিতে পা রাখলেন এই শান্তির দূতরা। দিল্লিতে আনুষ্ঠানিকতা শেষেই শুরু হবে তাদের মূল পদযাত্রা, যা এই অঞ্চলের মানুষের মনে শান্তি ও মৈত্রীর নতুন আলো ছড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরো পড়ুন>>: শান্তিপদযাত্রা করতে দলবল নিয়ে ভারতে পৌঁছালেন বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষু