একদিন প্রাতঃকালে বুদ্ধ এবং তাঁর প্রিয় শিষ্য আনন্দ একটি গ্রামের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাস্তার পাশে এক কৃষক জমিতে লাঙ্গল দিচ্ছিল। হাঁটার সময় বুদ্ধ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটি বস্তুর দিকে তাকিয়ে আনন্দকে বললেন, “দেখো আনন্দ, পথের ধারে একটি তীব্র বিষধর সাপ পড়ে আছে!”
আনন্দ সেদিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ প্রভু, এটি সত্যিই এক ভয়ানক ও মারাত্মক বিষধর সাপ!”
কাছেই কাজ করতে থাকা কৃষকটি তাঁদের কথা শুনতে পেল। সে মনে মনে ভাবল, “সন্ন্যাসীরা পথ দিয়ে যাওয়ার সময় কিসের সাপের কথা বলছেন? দেখি তো গিয়ে!”
বুদ্ধ ও আনন্দ চলে যাওয়ার পর কৃষকটি কৌতুহলবশত সেই জায়গায় গেল। ঝোপের আড়ালে গিয়ে সে দেখল, সেখানে কোনো সাপ নেই—বরং রত্ন ও সোনায় ভরা একটি বড় চামড়ার থলে পড়ে রয়েছে। সম্ভবত কোনো ডাকাত দল চুরির পর তা তাড়াহুড়োয় ফেলে গেছে।

কৃষকটি তো আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। সে ভাবল, “সন্ন্যাসীরা মূর্খের মতো অমূল্য সোনাকে সাপ ভেবে চলে গেল!” সে সোনার থলেটি লুকিয়ে বাড়ি নিয়ে এল এবং রাতারাতি নিজের জীবনযাত্রা বদলে ফেলল। দামি পোশাক, ভালো খাবার ও গয়না কিনে সে অপব্যয় করতে লাগল।
কিছুদিন পর রাজকোষ থেকে সোনা চুরির বিষয়টি ফাঁস হলো। রাজার রক্ষীরা চোরের খোঁজে গ্রামে তল্লাশি চালাতে চালাতে সেই কৃষকের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলো। তার বাড়িতে প্রচুর রাজকীয় সোনা পেয়ে রক্ষীরা তাকে গ্রেপ্তার করল। রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তির নির্দেশ দিলেন।
কারাগারে বন্দি হয়ে কৃষকটি হাহাকার করে কাঁদতে লাগল। সে বুঝতে পারল, সেই সোনা প্রকৃতপক্ষে সাধারণ কোনো অর্থ ছিল না, তা ছিল এক ধ্বংসাত্মক ‘বিষধর সাপ’, যা তার জীবনকে পুরোপুরি ছারখার করে দিয়েছে। বুদ্ধের দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার কথা তার মনে পড়ে গেল।
পরদিন সকালে তাকে রাজ দরবারে ফাঁসি বা শাস্তির জন্য নিয়ে যাওয়া হলে কৃষকটি বিলাপ করে বলতে লাগল, “ওহ প্রভু বুদ্ধ! আপনি সত্য বলেছিলেন, ওটি সোনা ছিল না, ওটি ছিল বিষধর সাপ! আর আনন্দ, তুমিও সত্য বলেছিলে, ওটি মারাত্মক বিষধর সাপ ছিল!”
রাজা কৃষকের মুখে বুদ্ধ ও আনন্দের নাম শুনে তাকে থামালেন এবং ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন। কৃষকটি সত্য ঘটনা খুলে বলল যে, সে বুদ্ধের কথা না শুনে লোভের বশে সেই সোনা তুলে নিয়েছিল।
রাজা বুদ্ধের প্রজ্ঞা ও কৃষকের সরল অনুশোচনা বুঝতে পেরে তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি দিলেন, তবে তাকে লোভের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিলেন। মুক্ত হয়ে কৃষকটি সোজা বুদ্ধের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইল এবং নিজের জীবনের লোভ ত্যাগ করে সৎ পথে চলার শিক্ষা গ্রহণ করল।
শিক্ষণীয় বিষয়: অসংযত লোভ এবং অন্যায়ভাবে অর্জিত ধন-সম্পদ দেখতে আকর্ষণীয় মনে হলেও তা প্রকৃতপক্ষে জীবনের জন্য বিষাক্ত সাপের মতোই ধ্বংসাত্মক হতে পারে। সজাগ দৃষ্টি ও সংযমই মানুষকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে।
_ধম্মপদ, বালবগ্গ (Fools Chapter), শ্লোক ৬৭