হিমালয়ের বৌদ্ধ ঐতিহ্যবাহী দেশ ভুটানে একদিনে ১০৮টি বৌদ্ধ স্তূপ (চোরতেন) নির্মাণের এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দেশটির রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকের উদ্যোগে ‘প্রজেক্ট ১০৮’-এর আওতায় গত ১ নভেম্বর এ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এ উপলক্ষে ১ থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।
ভুটানের দক্ষিণাঞ্চলের গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটির মাও চু নদীর তীরবর্তী প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকায় স্তূপগুলো নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি স্তূপের উচ্চতা ১৫ মিটার এবং একটির সঙ্গে অন্যটির দূরত্ব ১০৮ মিটার। এ মহতী উদ্যোগ বাস্তবায়নে ৪০ হাজারেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে ভুটানের কেন্দ্রীয় সন্ন্যাসী সংঘের প্রধান জে খেনপো সভাপতিত্ব করেন। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৭০ জনেরও বেশি বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা এবং ভুটানের শতাধিক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। আয়োজনে আনুমানিক দুই লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। ভুটানের রাজপরিবারের সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা ও বিদেশি অতিথিরাও উপস্থিত ছিলেন।

১ নভেম্বর ভোররাত ৩টায় ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় বাদ্যযন্ত্র ‘দুংচেন’ বাজানোর মধ্য দিয়ে ১০৮টি স্থানে একযোগে নির্মাণকাজ শুরু হয়। এ সময় ভক্তরা করুণার বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বরের উদ্দেশে নিবেদিত ‘ওঁ মণি পদ্মে হুং’ মন্ত্র জপ করেন। ভিক্ষুদের ধর্মীয় আচার ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দুপুরের মধ্যে সবগুলো স্তূপের মূল কাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
পরবর্তী দিনগুলোতে স্তূপগুলোর পবিত্রীকরণ, পূজা, প্রদক্ষিণ ও ধর্মদেশনার আয়োজন রাখা হয়েছে। সমাপনী দিনে ১৭তম কর্মাপা ওগিয়েন ত্রিনলে দর্জে দীর্ঘায়ু অভিষেক প্রদান করবেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
জাতীয় ঐক্য ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতীক
অনুষ্ঠানে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক বলেন, ১০৮টি স্তূপ নির্মাণের চেয়েও বড় অর্জন হলো দেশের মানুষের ঐক্য, সহযোগিতা, দেশপ্রেম ও মানবকল্যাণে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসার মানসিকতা। তিনি বলেন, ভুটানের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দেশটির জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
বৌদ্ধ ঐতিহ্যে স্তূপ নির্মাণকে অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘জাংচুব চোরতেন’ বা জ্ঞানালোকপ্রাপ্তির স্তূপ গৌতম বুদ্ধের বোধিলাভের স্মারক। বৌদ্ধ স্থাপত্যে স্তূপ বুদ্ধের জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত চিত্তের প্রতীক এবং অজ্ঞতা থেকে প্রজ্ঞার পথে আধ্যাত্মিক অগ্রযাত্রাকে নির্দেশ করে।
এ বছর প্রজেক্ট ১০৮-এর আয়োজন বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুণ্যতিথি ‘লহাবাব দুচেন’-এর সঙ্গে সমন্বিত হয়েছে। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুসারে, এ দিনে ত্রায়স্ত্রিংশ স্বর্গলোকে ধর্মদেশনা শেষে গৌতম বুদ্ধের পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের ঘটনা স্মরণ করা হয়।
উল্লেখ্য, ভুটানের গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি প্রকল্পের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, আধ্যাত্মিকতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। দেশটির জাতীয় সুখ (Gross National Happiness) দর্শনের আলোকে এ নগরীকে টেকসই উন্নয়নের একটি মডেল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভুটানের এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সমাজে ধর্মীয় ঐতিহ্য, জাতীয় ঐক্য ও সম্মিলিত মানবকল্যাণের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরো পড়ুন>>: একদিনে ১০৮টি বৌদ্ধ স্তূপ নির্মাণ: ভুটানে ঐতিহাসিক আয়োজন- যুক্তরাষ্ট্রে ২২.৬ মিটার উচ্চতার তিব্বতি বৌদ্ধমন্দির নির্মাণের উদ্যোগ
- ভারতে পালি ভাষা অধ্যয়নের উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্তে শিক্ষাবিদদের সমালোচনা
- আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ ধর্মীয় আয়োজনে লাদাখের অংশগ্রহণ বাড়াতে এমআইএমসিতে আলোচনা
- কুশলায়ন ধর্ম ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগে শিক্ষার্থীর মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ
- Buddhist Wisdom Shared Through Modern Digital Technology