একসময় শ্রাবস্তী নগরীর জেতবন বিহারে বুদ্ধদেব ধর্মদেশনা দিতেন। তাঁর বাণী শুনে মানুষের মন আলোকিত হতো, শিষ্যসংখ্যা বাড়তে থাকত। কিন্তু অন্যান্য তীর্থিক সম্প্রদায়ের সাধুরা দেখতে পেল, তাদের অনুগামী ও দান কমে যাচ্ছে। ঈর্ষায় জ্বলে উঠে তারা একসাথে পরামর্শ করল, “কীভাবে এই গৌতম শ্রমণের সুনাম নষ্ট করা যায়?”
তাদের দলে ছিল এক পরম সুন্দরী পরিব্রাজিকা— চিঞ্চা মানাবিকা। তার রূপ এমন যেন দেবলোকের অপ্সরার মতো। তারা তাকে বলল, “তুমি যদি আমাদের মঙ্গল চাও, তবে গৌতমকে কলঙ্কিত করো।” চিঞ্চা মানাবিকা রাজি হলো।
প্রতি সন্ধ্যায় সে ফুল হাতে জেতবনের দিকে যেত, আর ভোরে সেখান থেকে ফিরত। লোকে জিজ্ঞেস করলে সে বলত, “আমি রাত কাটিয়েছি শ্রমণ গৌতমের গন্ধকুটিতে।” ধীরে ধীরে কুৎসা ছড়িয়ে পড়ল। তিন-চার মাস পর সে পেটে কাপড় জড়িয়ে গর্ভবতীর ভান করতে শুরু করল। আট-নয় মাস পরে পেটে একটি গোলাকার কাঠের চাকতি বেঁধে, হাত-পা ফুলিয়ে, ক্লান্তির অভিনয় করে সে এক সন্ধ্যায় জেতবনে এসে উপস্থিত হলো।

বুদ্ধ তখন বিশাল জনসমাগমে ধর্মদেশনা দিচ্ছিলেন। চিঞ্চা সামনে এসে উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলল—
“হে মহাশ্রমণ! তুমি অন্যদের ধর্ম শেখাও, কিন্তু আমাকে গর্ভবতী করে এখন কোনো ব্যবস্থা করছ না। প্রসবের ঘরও সাজাওনি, ঘি-তেলেরও ব্যবস্থা নেই। তুমি শুধু নিজের সুখ ভোগ করো!”
সভাস্থল স্তব্ধ হয়ে গেল। বুদ্ধ শান্ত গলায় বললেন, “ভগিনি, তুমি যা বলছ, তা সত্য না মিথ্যা—সেটা শুধু তুমি আর আমি জানি।”
চিঞ্চা আরও জোর গলায় বলল, “হ্যাঁ, শুধু আমরা দুজনেই জানি।” সে কথা বলতে বলতে হাত নেড়ে অভিযোগ করতে লাগল। হঠাৎ তার গায়ের চাদর একটু সরে গেল। কাছের কয়েকজন লোক লক্ষ্য করল, তার পেটের ফোলা অংশ শক্ত ও অস্বাভাবিক। কেউ একজন সন্দেহ করে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এ কী ব্যাপার?” চিঞ্চা পিছু হটতে গিয়ে হোঁচট খেল। কাঠের টুকরো তার কাপড়ের ভেতর থেকে সরে এসে মাটিতে পড়ে গেল।
সবাই দেখতে পেল—পেটের ফোলা কোনো সন্তান নয়, কাঠের টুকরো। জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ল। “মিথ্যাবাদিনী! প্রতারক!” তারা তাকে ধাক্কা মেরে, গালি দিয়ে তাড়িয়ে দিল। চিঞ্চা লজ্জায় ও ভয়ে ছুটে পালাল। তার সুনাম চিরতরে নষ্ট হয়ে গেল। যে সম্প্রদায় তাকে ব্যবহার করেছিল, তারাও তাকে আর গ্রহণ করল না।
পরদিন ভিক্ষুরা আলোচনা করছিলেন, “চিঞ্চা মানাবিকা মিথ্যা অভিযোগ করে কী ভয়ংকর পরিণতি ভোগ করল!” বুদ্ধ তখন বললেন, “ভিক্ষুগণ, এটা তার প্রথম নয়। পূর্বজন্মেও সে আমাকে মিথ্যা অভিযোগ করেছিল।” এবং তিনি মহাপদুম জাতকের কাহিনি বললেন।
শেষে তিনি এই গাথা উচ্চারণ করলেন— “যে ব্যক্তি এক ধর্ম (সত্য) লঙ্ঘন করে, মিথ্যা কথা বলে, পরলোক ত্যাগ করে—সে এমন কোনো পাপ নেই যা করতে পারে না।”
এই ঘটনায় সবাই বুঝতে পারল—সত্য কখনো চাপা পড়ে না। মিথ্যার আবরণ যত মজবুতই হোক, একদিন তা ভেঙে যায়। আর যারা নির্দোষকে কলঙ্কিত করে, তাদের নিজেদেরই ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয়।
_ধম্মপদ-এর ১৭৬ নম্বর শ্লোক (লোক বগ্গ / Loka Vagga)
আরো পড়ুন>>: বুদ্ধের প্রতি চিঞ্চা মানাবিকার মিথ্যা অভিযোগ