লন্ডনে বুদ্ধ পূর্ণিমা: লন্ডনে বাংলাদেশি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের প্রবাসী বাঙালি মহলে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। গত রবিবার পূর্ব লন্ডনের ‘জেতবন বিহার লন্ডন’-এ (বোধিজ্ঞান মেডিটেশন অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার ইউকে) অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও ধর্মীয় মর্যাদায় সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ—এই ত্রিস্মৃতি বিজড়িত ভেসাক উৎসব বা বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপিত হয়। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি বৌদ্ধরা নিজদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য বজায় রাখতে এই প্রার্থনাসভায় সমবেত হন।
জেতবন বিহারে আয়োজিত এই উৎসবে দিনব্যাপী নানাবিধ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ছিল বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, সংঘদান, পিণ্ডদান, ধ্যান এবং সদ্ধর্ম দেশনা। এছাড়া এপ্রিল ও মে মাসে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের বুদ্ধের আশীর্বাদসহ জন্মদিন উদ্যাপন করা হয়। আন্তর্জাতিক ধাম্মাকায়া ঐতিহ্যের অনুসরণে অনেক উপাসক-উপাসিকা শ্বেতশুভ্র বস্ত্র পরিধান করে অনুষ্ঠানে অংশ নেন, যা উৎসবে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে।
লন্ডনে বুদ্ধ পূর্ণিমা: বাংলাদেশি বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ ও জেতবন বিহারের ভূমিকা
পূর্ব লন্ডনের রেইনহামে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জেতবন বিহার লন্ডন’, যা যুক্তরাজ্যের বুকে প্রথমদিকের বাংলাদেশি বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর একটি। বুদ্ধের বাণী প্রচার, ধ্যান অনুশীলন এবং বাংলাদেশি বৌদ্ধদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় এই বিহারটি বর্তমানে মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বিহারের অধ্যক্ষ, থাইল্যান্ডে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষাপ্রাপ্ত প্রাজ্ঞ ভিক্ষু ভদন্ত শাসনকীর্তি এইচ. মহীপাল মহাথেরো জানান, লন্ডনে বাংলাদেশি বৌদ্ধ সমাজ তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও, তাঁরা ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তাঁর এই দূরদর্শী উদ্যোগের আগে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিজস্ব কোনো বিহার ছিল না, ফলে ধর্মীয় উৎসবের জন্য তাঁদের শ্রীলঙ্কান বিহারগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো।
বিহার পরিচালনা কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক আনন্দ সিংহ এই উদ্যোগ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, নিজস্ব বিহার প্রতিষ্ঠার ফলে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম বুদ্ধের কালজয়ী শিক্ষা এবং নিজেদের বাঙালি বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রিটিশ আমল থেকেই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বৌদ্ধদের আগমন শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে স্থানান্তরের মাধ্যমে লন্ডনে বাংলাদেশি বৌদ্ধদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পূর্ব লন্ডনের রমফোর্ডে ‘বাংলাদেশ বুদ্ধ বিহার’ নামে আরও একটি বাংলাদেশি বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
গত রবিবারের প্রাথমিক উদ্যাপনের পর, আগামী ১৪ জুন আরও বৃহৎ পরিসরে ভেসাক উৎসব উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিয়েছে জেতবন বিহার কর্তৃপক্ষ। উক্ত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন দেশের প্রাজ্ঞ ভিক্ষুসংঘ, বৌদ্ধ পণ্ডিত এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নেবেন। লন্ডনের মতো ব্যস্ত পশ্চিমা মহানগরে নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই প্রাণবন্ত প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়।
আরো পড়ুন>>: লন্ডনে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপন: ১৪ জুন বৃহৎ আয়োজনের প্রস্তুতি