সংসদ অধিবেশনে ড. জ্ঞানশ্রী: বাংলাদেশের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু, একুশে পদকপ্রাপ্ত ত্রয়োদশ সংঘরাজ পূজনীয় ড. জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের মৃত্যুতে চলমান বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। সংসদ স্পিকার কর্তৃক উত্থাপিত এক শোক প্রস্তাবের মাধ্যমে এই মহান আধ্যাত্মিক সাধক ও সমাজ সংস্কারকের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়।
শোক প্রস্তাবে প্রয়াত পূজনীয় জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের নির্বাণ সুখ কামনা করা হয় এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত ভক্ত-অনুরাগী ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়। শোক প্রস্তাব পাসের পর সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।

মানবকল্যাণ ও সমাজ সংস্কারে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এই শোক প্রস্তাবে ড. জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের বর্ণাঢ্য জীবন ও মানবকল্যাণে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করা হয়।
জন্ম ও দীক্ষা: ১৯২৫ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানে জন্মগ্রহণকারী এই মহান মনীষী ১৯৪৪ সালে প্রব্রজ্যা গ্রহণের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি পূর্ণ ভিক্ষুত্ব লাভ করেন এবং দীর্ঘ আট দশক ধরে অহিংসা ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করে যান।
অনাথ ও অনগ্রসরদের আশ্রয়: তিনি কেবল ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের অবহেলিত মানুষের শিক্ষা ও কল্যাণে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২০টিরও অধিক অনাথ আশ্রম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তিনি হাজার হাজার দরিদ্র ও অনাথ শিশুর জীবনের আলো জ্বালিয়েছেন, যার কারণে তিনি ‘অনাথদের পিতা’ হিসেবে সমাদৃত ছিলেন।
শিক্ষা ও কল্যাণ ট্রাস্ট: নিজের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় (প্রায় আড়াই কোটি টাকা) বিলিয়ে দিয়ে তিনি ‘বাংলাদেশ বুদ্ধ শাসন কল্যাণ ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নে অনন্য ভূমিকা রাখছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: সমাজসেবায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২২ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়াও মিয়ানমার সরকার তাঁকে ‘অগ্রমহাপণ্ডিত’ ও থাইল্যান্ডের মহাচুলালংকর্ন রাজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। ২০২০ সালে তিনি বাংলাদেশি বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় আসন ‘ত্রয়োদশ সংঘরাজ’ পদে অধিষ্ঠিত হন।
শতবর্ষী এই মহাপুরুষ ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের মাধ্যমে রাষ্ট্র তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবসেবা ও অহিংসার দর্শনকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে স্মরণ করল।
আরো পড়ুন>>: সংসদ অধিবেশনে ড. জ্ঞানশ্রী মহাস্থবিরের প্রয়াণে শোক প্রস্তাব গৃহীত- পাকিস্তানে বৌদ্ধ ঐতিহ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন: বিশ্বকে রক্ষার আহ্বান
- কক্সবাজারে বৌদ্ধ যুব পরিষদের নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ
- লন্ডনে বুদ্ধ পূর্ণিমা উদ্যাপন: ১৪ জুন বৃহৎ আয়োজনের প্রস্তুতি
- যুক্তরাষ্ট্রের বৌদ্ধ মঠে আগুন: সন্দেহভাজন নারী গ্রেপ্তার
- A Global Nomad: International Buddhist Scholar Sonakanti Barua