আমরা বৌদ্ধরা একটা বাক্য খুব গর্ব করে বলি “বুদ্ধ তার ধর্ম প্রচারে এক বিন্দু রক্তপাত বা কাউকে তলোয়ারের ভয় দেখান নি।” বৌদ্ধরা কারো রক্ত না ঝড়ালেও যুগে যুগে বৌদ্ধদের রক্তে সাগর তৈরী করেছে অনেক শাসক ও ধর্ম প্রচারক। বৌদ্ধধর্মের অহিংসা নীতির কারণে যুগযুগ ধরে বৌদ্ধরা অন্যেরা দ্বার অত্যচারিত হয়েছে। কখনো অত্যাচারের প্রতিঘাত করেনি। অন্তত ইতিহাস সেটাই বলে। চলুন জেনে আসি চীনে বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিষ্ঠার করুণ কাহিনী।
চীনে বৌদ্ধধর্ম
সারা বিশ্বের যে সব দেশ এবং সংস্কৃতিতে বৌদ্ধধর্ম অনুশীলিত হয় তাদের মধ্যে চীন অন্যতম। চীনে মহাযান বৌদ্ধধর্মের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা এবং দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে।
তৎতকালিন সময়ে সমগ্র ভারত বর্ষ জুড়ে একটাই ধর্ম সেটি বৌদ্ধধর্ম। ভারতের গন্ডি পেরিয়ে যখন বৌদ্ধ ধর্ম চীনে প্রবেশ করলো, সেখানেও সাধারণ জনগণকে বুদ্ধের অমৃত বাণী মুগ্ধ করেছিল।
যদিও চীনা সংস্কৃতিতে খাপ খাইয়ে বৌদ্ধধর্ম সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে করতে পেরেছিল, তবুও চীনে বৌদ্ধধর্ম প্রচার ও প্রসারিত হওয়া খুব বেশি সহজ ছিল না। পূর্বে মূলত ধর্ম বিশ্বাস, আচার এগুলো রাজা কেন্দ্রিক ছিল। রাজা যেটা মানতো সবাইকে তা মানতে হতো। রাজা যেটা বিশ্বাস করতো সবাইকে তা বিশ্বাস করতে হতো। অন্যভাবে যদি বলা হয়, সাধারণ জনগণ রাজাকে অনুসরণ করতো। রাজার ইচ্ছায় যেন তাদের ইচ্ছ।
চীনা সমরাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকের আগমনের সাথে সাথে তাদের বিশ্বাসেও পরিবর্তন দেখা যেত। শুরুর দিকে চীনের অনেক শাসক বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিল। যখন চীনারা ধীরে ধীরে বৌদ্ধধর্মের প্রতি দূর্বল হতে শুরু করল তখন অনেক শাসক দ্বারা তাদের অত্যাচারিত হওয়ার প্রমাণও আছে।
চীনে বৌদ্ধধর্মের সূচনা
প্রায় ২,০০০ বছর আগে হান রাজবংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে চীনে পৌঁছেছিল। পূর্বে চীন থেকে অনেক ব্যবসায়ী ভারতে বানিজ্য করতে আসতেন। সম্ভবত প্রথম শতাব্দীর শুরুর দিকে চীনের পশ্চিম এলাকার ব্যবসায়ীরাই প্রথম চীনাদের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের পরিচয় করিয়ে দেয়।
এর আগে হান রাজবংশের রাজাগণ কনফুসিয়ান ধর্মের অনুসরী ছিল। স্বাভাবিকভাবে বেশিরভাগ জনগনও কনফুসিয়ানিজমে বিশ্বাসী থাকার কথা। কনফুসিয়ানিজম নীতিশাস্ত্র এবং সমাজে সামঞ্জস্যতা, সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। অন্যদিকে বৌদ্ধধর্ম বাস্তবের বাইরের বাস্তবতাকে সন্ধানের জন্য সন্ন্যাসী জীবনে প্রবেশের উপর জোর দেয়। কনফুসিয়ানিজমে বিশ্বাসী ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের সবসময় বৈরীতাপূর্ণ ছিল।
তবুও ধীরে ধীরে চীন জুড়ে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। ২য় শতাব্দীতে কয়েকজন বৌদ্ধ ভিক্ষু পালি ভাষা থেকে বৌদ্ধধর্মীয় সূত্র, নিয়মনীতি ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বিষয় চীনা ভাষায় অনুবাদ করেন। তাদের মধ্যে, গান্ধার রাজ্যের ভিক্ষু লোকক্ষেম, এবং পার্থিয়ান ভিক্ষু আন শিহ-কাও ও আন-শুয়ান উল্লেখযোগ্য।
উত্তর ও দক্ষিণ রাজবংশের উদ্ভব
২২০ সালে হান রাজবংশের পতনের পর চীন জুড়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার শুরু হয়। চীন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য এবং দলের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ৩৮৫ থেকে ৫৮১ সাল পর্যন্ত সময়কে উত্তর এবং দক্ষিণ রাজবংশের সময় বলা হলেও প্রকৃত পক্ষে রাজনৈতিক বাস্তবতা এর চেয়ে জটিল ছিল। এই নিবন্ধটিতে আমরা উত্তর এবং দক্ষিণ চীনকে নিয়ে তুলনা করব।
উত্তর চীনের একটি বিরাট অংশ জুড়ে মঙ্গোলদের পূর্বসূরী জিয়ানবেই উপজাতি আধিপত্য লাভ করেছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে যারা ভবিষ্যদ্বাণী করতেন তারা এই “barbarian” উপজাতির শাসকদের পরামর্শদাতা হয়েছিলেন। ৪৪০ সালের মধ্যে জিয়ানবাই বংশে সমগ্র উত্তর চীনকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়।
এদিকে ৪৪৬ সালে, ওয়েই শাসক সম্রাট তাইওয়ু রাজ্য শাসনে আসার পর বৌদ্ধধর্মের উপর নির্মম দমন-পিড়ন শুরু করে। সমস্ত বৌদ্ধ মন্দির, গ্রন্থ ও স্থাপত্য-শিল্প ধ্বংস করা হয় এবং অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। উত্তর চীন ভিক্ষু সংঘের কিছু অংশ পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারা মৃত্যু দন্ডের হাত থেকে প্রাণে রক্ষা পায়।
৪৫২ সালে সম্রাট তাইওয়ুর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরসূরী সম্রাট জিয়াওউন বৌদ্ধদের উপর দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে বৌদ্ধধর্মের পুনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করেন। তার হাত ধরেই ইউঙ্গাংয়ের বিখ্যাত গ্রোটোস ভাস্কর্য নির্মিত হয়। চীনের ল্যাঙ্গমেন গ্রোটস-এর প্রথম ভাস্কর্যটিও জিয়াওয়ের রাজত্বকালে সনাক্ত করা যায়।
পরবর্তীতে দক্ষিন চীনে শিক্ষিত চীনাদের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম একটি মার্জিত ধর্ম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। তারা বুঝতে পারলো বৌদ্ধধর্মই আত্মদর্শন ও নৈতিক শিক্ষার একমাত্র উপায়। মূলত জিয়াওউনের সময় থেকে চীনা সমাজের অভিজাতরা বৌদ্ধ ভিক্ষুত্ব গ্রহণ কতে শুরু করে এবং একসময় চীনে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিতদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে দক্ষিণ চীনে প্রায় ২,০০০ বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। ৫০২ সাল থেকে ৫৪৯ সাল পর্যন্ত লিয়াংয়ের সম্রাট উঃ দক্ষিন চীন শাসন করেন। উঃ এর শাসনকালেই দক্ষিন চীনে বৌদ্ধধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ ফুল হয়ে প্রস্ফুটিত হয়। সম্রাট উঃ একজন ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ এবং বিহার, মঠ, চৈত্য নির্মাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
নতুন বৌদ্ধ স্কুল
মূলত ৪র্থ শতাব্দী থেকেই চীনে মহাযান বৌদ্ধধর্মের বিদ্যালয়ের উত্থান শুরু হয়েছিল। ৪০২ খ্রিস্টাব্দে, বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং শিক্ষক হুই-ইউয়ান (৩৩৬-৪১৬) দক্ষিণ-পূর্ব চীনের লুশান মাউন্টে হোয়াইট লোটাস সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটিই ছিল বৌদ্ধধর্মের প্রথম Pure Land school। পরবর্তীতে Pure Land school পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
আনুমানিক ৫০০ সালে বোধিধর্মা (৪৭০ থেকে ৫৪৩) নামে এক ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু চীন ভ্রমণ করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, বোধিধর্মা লিয়াংয়ের সম্রাট উঃ-এর সাথেও দেখা করেছিলেন। এরপরে তিনি হেনান প্রদেশের উত্তর অংশে ভ্রমণ করেছিলেন। ঝেংঝুয়ের শাওলিন মঠের আওতায় তিনি চ’আন স্কুল নামে একটি বৌদ্ধধর্মীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীতে সেটি পশ্চিমা বিশ্বে জাপানি নাম, ”জেন” নামে অধিক পরিচিতি পায়।
৫৩৮ সালে টিয়ানতাই স্কুল, ৫৫৭ সালে হুয়া-ইয়েন স্কুল, ৬০২ সালে চিহ-ইয়েন, ৬৪৩ সালে ফা-সাং স্কুল চীনে বৌদ্ধ ধর্ম অনুসীলনের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হয়ে গড়ে ওঠে।
এগুলো ছাড়াও চীনে আরো বেশ কিছু বৌদ্ধ স্কুল ছিল যা মি-সুনং বা “গোপনীয় স্কুল” হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে বজ্রাযান বৌদ্ধধর্মের চার্চা হতো।
উত্তর চীন এবং দক্ষিণ চীনের পুনর্মিলন
স্যুই সম্রাটের অধীনে ৫৮৮ সালে উত্তর এবং দক্ষিণ চীন পুনরায় মিলিত হয়। কয়েক শতাব্দী বিচ্ছিন্ন থাকার পর বৌদ্ধধর্ম ব্যতীত দুটি অঞ্চলের মধ্যে খুব সামান্য মিল ছিল। সম্রাট স্যুই বুদ্ধের দেহ ধাতু সংগ্রহ করে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে সমগ্র চীন জুড়ে অনেকগুলো বৌদ্ধ মুর্তি ও স্তূপ নির্মাণ করে। সমগ্র চীন জুড়ে তখন বৌদ্ধধর্মের জয়গান আর জয়গান। বৌদ্ধ স্থাপনা দেখে তারা বুঝতে পারলো এক সময় সবাই চীনা জাতী ছিল
ত্যাং রাজবংশ
ত্যাং রাজবংশের সময় (৬১৮ থেকে ৯০৭) চীনে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব শীর্ষে পৌঁছেছিল। এই সময় বৌদ্ধ স্থাপত্য শিল্পের বিকাশ এবং বিহার গুলোর আকার বড় ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
দলীয় কলহের জের ধরে ৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে আবারও বৌদ্ধধর্মের উপর দমন-পিড়ন শুরু হয়। এই অত্মকলহে প্রায় ৪,০০০ টি’রও বেশি বড় বিহার এবং প্রায় ৪০,০০০ টি ছোট ছোট মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল।
এই নির্মম দমন-পিড়ন চীনা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক পঙ্গু আঘাত হিসেবে দেখা দেয়। সেসময় চীনে বৌদ্ধ ধর্ম এক কথায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল বলা চলে। মূলত তখন থেকেই চীনে বৌদ্ধ ধর্মের দীর্ঘ পতনের সূচনা।
বৌদ্ধ ধর্ম আর কখনও চীনে ততটা প্রাধান্য পাবে কিনা সন্দেহ যতটা ত্যাং রাজবংশের সময়ে ছিল। এতো কিছুর পরও হাজার হাজার বছর ধরে আজ পযর্ন্ত বৌদ্ধধর্ম চীনা সংস্কৃতিকে পুরোপুরি প্রভাব প্রভাবিত করে রেখেছে। স্থানীয় কনফুসিয়ানিজম এবং তাও ধর্মের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মগুলিকেও প্রভাবিত করে রেখেছে বৌদ্ধ ধর্ম।
চীনে যে কয়েকটি স্বতন্ত্র স্কুলের উদ্ভব হয়েছিল, তার মধ্যে কেবল Pure Land এবং Ch’an-ই উল্ল্যেখ যোগ্য সংখ্যক অনুসারীকে দমন থেকে বাচাঁতে পেরেছিল এবং এখনো তা জীবিত আছে।
লাফিং বুদ্ধ
চীনে বৌদ্ধ ধর্মের প্রথম হাজার বছর শেষ হওয়ার পর দশম শতাব্দীতে বুধাই বা পু-টাই নামে পরিচিত লাফিং বুদ্ধের উদ্ভব হয় যার বাস্তবিক কোন প্রামাণ পাওয়া যায়নি। লাফিং বুদ্ধ সম্পূর্ণ চীনা লোককাহিনী থেকে উদ্ভূত একটি চরিত্র। এই রোটানড চরিত্রটি চীনা শিল্পের প্রিয় বিষয় হিসাবে রয়ে এখনো রয়ে গেল।
বর্তমানে চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১.৩ বিলিয়ন। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে এই জনসংখ্যার প্রায় ১৮.২% থেকে ২০% মানুষ বৌদ্ধধর্ম পালন করে। বাকিদের কিছু অংশ খ্রিষ্টানধর্ম, কিছু অংশ স্থানীয় ধর্ম এবং বিরাট একটি অংশ কোন ধর্ম পালন করে না।
আরো পড়ুন>>
- ভিয়েতনামে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস।
- যোগদনা করুন সুইডেনের বৌদ্ধধর্মীয় কনফারেন্সে।
- বিশ্বের শীর্ষ বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ।
- নরকের দিন-রাত্রি কত দীর্ঘ?
- বৌদ্ধ ধর্মে নরক কয়টি ও কি কি?
Dhammapada bangla cholito vasai rupantor korle bujar khub sohoj hoto