ধর্ম বিজয় শুভ হউক

  • হাসানুর রহমান

গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে যে ধর্ম প্রচার করছেন তা বৌদ্ধ ধর্ম নামে পরিচিত। আজ (১৫ মার্চ) বৈশাখী পূর্ণিমা। গৌতম বুদ্ধের জন্ম, জ্ঞান লাভ ও মহাপরিনির্বাণের দিন। এমন মহতি দিনে মহান ব্যক্তিকে ঘিরে লিখতে বসা।

বৌদ্ধ কিংবদন্তি আমাদেরকে জানাচ্ছে- জ্যোতিষী কোণ্ডণ্য ভবিষ্যৎবাণী করে বলেছিলেন, ‘রাজপুত্র সিদ্ধার্থ সর্বজ্ঞ বুদ্ধ হবেন’। কিন্তু পিতা শুদ্ধোদন কোণ্ডণ্যের এই ভবিষ্যৎবাণী পছন্দ করেননি। তিনি চেয়েছিলেন তার পুত্র সিদ্ধার্থ রাজ-চক্রবর্তী হউক।

কার্যত সিদ্ধার্থ জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎবাণী আর পিতার আকাঙ্ক্ষাকে বিপুল পরিসরে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। রাজসুলভ রাজ্য জয় তথা ভূমি জয়কে তাচ্ছিল্য করে তিনি যেই পথে হেটেছিলেন, সেই পথ ধর্ম-জয়ের পথ। ধর্ম-জয়ের পথেই তিনি জয় করেছেন মানবতার অনন্ত মনোভূমি; জয় করেছেন, মানবিক আধ্যাত্মিকতার অসীম সাম্রাজ্য এবং বিশ্ব সংস্কৃতির অপার জগৎ। অচঞ্চল দৃঢ়তায় শতকোটি মানুষের মনোভূমি জয় করে, শতকোটি মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে ‘বুদ্ধ’ নামে ভূষিত হয়ে তিনি হয়েছেন, ধর্ম-চক্রবর্তী।

গৌতম বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্ম

তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম পূর্ণ বিকশিত হয়ে, সগর্বে নিজ জন্মভূমি ভারতবর্ষে বিজয়-নিশান উড়িয়েছে সুদীর্ঘ দেড় হাজার বছর ধরে। স্বদেশভূমির আনাচে-কানাচে বিজয়-নিশান প্রোথিত করে, তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম চিরন্তন সত্যের শাশ্বত বাণী বহন করে বেরিয়ে পড়েছিল দিগ্বিজয়ে। এই দিগ্বিজয়ের অংশ হিসেবে তাঁর প্রবর্তিত ‘ধর্মচক্র’ আবর্তন করেছে সমকালীন সময়ের গ্রীক দেশগুলোর অজস্র তত্ত্বচর্চার পীঠস্থান; আবর্তন করেছে আলেকজান্দ্রিয়া, সিরিয়াসহ হেলেনিস্টিক বিশ্বের দর্শনচর্চার অগণিত অধিষ্ঠান; আবর্তন করেছে মধ্য এশিয়ার অগণিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো; আর, চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার আধ্যাত্মিক মুখশ্রী।  

দুইশত কোটি মানুষের পদচারণায় মুখর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর পূর্ব এশিয়ার আধ্যাত্মিক জগৎ এখন গৌতম বুদ্ধের চিরস্থায়ী সাম্রাজ্য। চতুরঙ্গ সেনাদলে নয়, ঢাক-ঢোল বা দামামা-দুন্দুভি পিটিয়ে নয়, মানবিক বদান্যতার সুকোমল বাণী প্রচার করেই তিনি এই সীমাহারা সাম্রাজ্যটি জয় করে নিয়েছেন। এই সাম্রাজ্যের অসংখ্য জাতিগোষ্ঠীর অগণিত ধর্ম, অগণিত সংস্কৃতি, অগণিত দর্শন তাঁর বদান্যতা আর দার্শনিক মূল্যবোধের দ্বারা হাজার বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায় শাসিত হচ্ছে। এই মূল্যবোধ একজন আধুনিক প্রগতিশীল মানুষের মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, একজন চিন্তাশীল অগ্রগামী মানুষের কাছে অপরিচিত নয়। ভবিষ্যতের সুন্দরতর পৃথিবীর দিকে দ্রুততম সময়ে ছুটে যেতে চায় -এমন একজন মানুষের ছুটে চলার পথেও বুদ্ধদর্শন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। একারণেই, গৌতম বুদ্ধের এই বিজয় ক্ষয়িষ্ণু নয় স্বল্পস্থায়ী নয়- নিঃসন্দেহে অক্ষয়-অনশ্বর-চিরস্থায়ী।

গৌতম বুদ্ধের জীবনী

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে নজিরবিহীন এই মহৎ বিজয়টি সমাধা করতে গিয়ে তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম এই বিশাল অঞ্চলের অগণিত জাতিগোষ্ঠীর কৃষ্টি-সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার গতিপথে একটি কাঁটাও বিছায়নি। অভূতপূর্ব উদ্ভট তত্ত্ব-মতবাদের ভার চাপিয়ে দিয়ে মানুষের ঐতিহ্যগত রীতি-নীতি বা জীবনপ্রণালীর স্রোতধারায় নাক গলায়নি। তাদের মাতৃভাষার উপর চালায়নি স্বৈরাচারী অস্ত্রোপচার। তাদের আরাধনার মঞ্চে উপবিষ্ট ঈশ্বরগুলোকে উৎখাত করে প্রতিস্থাপন করেনি নতুন কোনো ঈশ্বর। তাদের আহার-আবাসসহ দৈনন্দিন জীবনের কোনও স্বাচ্ছন্দ্যের ঘাড়ে জুড়ে দেয়নি অস্বস্তিকর জোয়াল।

এমনকি, ধর্ম-জয়ের এই অভিযাত্রায় সেই অঞ্চলের একটি তুচ্ছ দুর্বাঘাসও বুদ্ধ ধর্মের বিজয়-রথের চাকায় পিষ্ট হয়নি! এসব কারণেই, ধর্মচক্রে আসীন বৌদ্ধ ধর্মের আগমনী ধ্বনি সেই অঞ্চলের শতকোটি মানুষের কানে সুমধুর সঙ্গীত হয়ে বেজেছে। তারা পুষ্পময় অভ্যর্থনায় বরণ করেছে বৌদ্ধ ধর্মকে; আর, চিরস্থায়ীভাবে ধর্মচক্রের প্রবক্তা গৌতম বুদ্ধকে অভিষিক্ত করেছে ধর্ম-চক্রবর্তী পদে। এই অভিষেক মহিমাময়। এই বিজয় গৌরবময়।

বহির্দেশে এই গৌরবময় বিজয়ের একজন সারথি হিসাবে এবং ভারতবর্ষের সীমানায় গৌতম বুদ্ধের সর্বশেষ সাম্রাজ্য বঙ্গভূমির একজন সন্তান হিসাবে আমার গর্ব অপরিসীম। কারণ, এই বিজয় বিশ্বের ইতিহাসে একমাত্র ধর্ম-বিজয়। এই বিজয় ভারতবর্ষের ইতিহাসে একমাত্র বিশ্ব-বিজয়।

বৌদ্ধ ঐতিহ্য মতে, আজকের পূর্ণচন্দ্রের মতোই এক পবিত্র পূর্ণচন্দ্রের তিথিতে বুদ্ধের আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে রোপিত হয়েছিল এই মহান বিজয়ের বীজ। আজকের পূর্ণচন্দ্রের মতোই এক পবিত্র পূর্ণচন্দ্রের তিথিতে বুদ্ধের বোধিজ্ঞান লাভের মধ্যে দিয়ে রোপিত হয়েছিল ধর্ম-চক্রবর্তী পদে তাঁর অভিষিক্ত হবার বীজ।

শুভ হউক বুদ্ধ পূর্ণিমা, শুভ হউক ধর্ম-বিজয়

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!