মিয়ানমারে ৪ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যার অভিযোগ

মিয়ানমারে ৪ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৩ মে সাগাইং অঞ্চলের প্যালে টাউনশিপের একটি বৌদ্ধ বিহারে সেনাবাহিনীর ছোড়া মর্টার শেলের আঘাতে এই চারজন ভিক্ষুর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর প্রকাশ করেছে দেশটির অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য ইরাবতী।

গতবছর (২০২১) ফ্রেব্রুয়ারিতে এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশটির শাসনভার গ্রহণ করেছে সেনাবাহিনী। সেনবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই দেশটির জনগণ এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে যাচ্ছে।

স্থানীয় এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে ইরাবতী লিখেছে, প্যালে টাউনশিপে সেনাদের উপর স্থানীয়রা আক্রমন করলে সৈন্যরাও মর্টার শেল নিক্ষেপ করে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। সৈন্যদের নিক্ষেপ করা মর্টার শেলের আঘাতে পাঁচজন আহত ও ৪ বৌদ্ধ ভিক্ষু নিহত হয়েছে। নিহত ভিক্ষুরা হলেন মায়া থেইন মনিস্টারির বিহারাধ্যক্ষ ও চারজন নবীন ভিক্ষু।

সাগাইং অঞ্চল হল মিয়ানমার সেনা শাসক বিরোধী একটি শক্ত ঘাঁটি এলাকা। সাগাইং এর নিয়ন্ত্রণ নিতে গত বছর থেকে শাসক সেনারা ওই এলাকার গ্রামগুলোতে হামলা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রায় প্রতিদিনই জান্তা সৈন্য ও স্থানীয় প্রতিরোধ গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। সর্বশেষ খবর মতে এই এলকায় আর্টিলারি ও বিমান হামলার আহ্বানও জানিয়েছে সেনাদের পক্ষ থেকে। ফলে সাগাইং অঞ্চলের হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েগেছে।

জান্তা-সামরিক নেতৃত্বাধীন সেনা প্রধান গত বছর ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা সুসংহত করেছে। ক্ষমতা ধরে রাখতে জান্তা সরকার, সামরিক শাসন বিরোধী জনগণের অসন্তোষ এবং রাস্তার বিক্ষোভের উপর সহিংস দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে অব্যহতভাবে। এমনকি দেশের শ্রদ্ধাবাজন বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘও এই দমন পিড়ন থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে পারছে না।

মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর গাড়ি বহরে হামলা

মায়ানমার- এবং থাইল্যান্ড-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারস (এএপিপি) রিপোর্ট করেছে যে ২৪ মে পর্যন্ত, সামরিক জান্তার হাতে ১৮৬১ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ৬১৫৮ টি বাড়িঘর গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় ভবন ধ্বংস ও লুটপাট করেছে বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে এই চিত্র কেবল তাদের দ্বারা প্রত্যক্ষ করা কেইস প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পর্যন্ত মোট ১০,৭৬৯ জনকে আটক, ১১৯৮ জনকে কারাদণ্ড এবং 113 জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংবাদ পরিষেবা আরএফএ-এর এপ্রিলেরি প্রতিবেদন মতে, গত বছর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে সেনাবাহিনীর হামলার শিকার হয়ে ৩৯ জন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মৃত্যু হয়েছে এবং ৪০ জনকে কারারুদ্ধ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারী থেকে ২০২২ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে, ৩৮ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং একজন নারী ভিক্ষুনী নিহত হয়েছে।

থেরবাদ বৌদ্ধ ঐতিয্যের দেশ মিয়ানমারের (বার্মা) বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। ২০০৭ সালে সামরিক জান্তা বিরোধী আন্দোলনে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। মিয়ানমারের ইতিহাসে যা জাফরান বিপ্লব নামে পরিচিত। ভিক্ষুদের ডাকে হাজার হাজার সাধারন জনগণ তখন রাস্তায় নেমে এসেছিল। ধারনা করা হয়, মিয়ানমারে প্রায় পাঁচ লক্ষ বৌদ্ধ ভিক্ষু আছে। প্রধানত ইয়াঙ্গুন এবং মান্দালয় শহরকে কেন্দ্র করে এবং এর আশেপাশে প্রায় ৭৫,০০০ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট, স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি এবং গভর্নিং ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) পার্টির অন্যান্য সদস্যদের আটক করার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী 1 ফেব্রুয়ারি 2021-এ এক বছরব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। 2020 সালের নভেম্বরে একটি সাধারণ নির্বাচনের পরে দেশের নতুন সংসদের ডাকা হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে অভ্যুত্থান ঘটেছিল, সেই সময়ে NLD যথেষ্ট নির্বাচনী লাভ করেছিল।

এদিকে এই বছর এপ্রিলে, রাজধানী নেপিদিও -এর একটি আদালত ৭৬ বছর বয়সী গণতন্ত্র পন্থি নেতা অং সান সু চিকে নগদ টাকা এবং সোনার বারে ষাট লক্ষ মার্কিন ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির বিরুদ্ধে ১১টি ফৌজদারি মামলার শাস্তি হিসেবে সব মিলিয়ে ১৯০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে তার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!