ভেসাক উৎসব: ইন্দোনেশিয়ায় ৫.৬ মিটারের স্বচ্ছ বুদ্ধ মূর্তির রেকর্ড

ভেসাক উৎসব: ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা এবং আধুনিক গণসংযোগের এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছে ইন্দোনেশিয়ার একটি বৌদ্ধ যুব সংগঠন। ২০২৬ সালের পবিত্র ভেসাক (বুদ্ধ পূর্ণিমা) উৎসবকে সামনে রেখে দেশটির উত্তর জাভার সুরাবায়া শহরের একটি প্রধান শপিং মলে উন্মোচন করা হয়েছে ৫.৬ মিটার উচ্চতার একটি অনন্য স্বচ্ছ বুদ্ধ মূর্তি। ‘দ্য ইয়ং বুড্ডিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ইন্দোনেশিয়া’ (YBAI)-এর উদ্যোগে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি ইতিমধ্যেই দেশটির বৃহত্তম স্বচ্ছ বুদ্ধ মূর্তি (রূপাং) হিসেবে ‘মিউজিয়াম রেকর্-দুনিয়া ইন্দোনেশিয়া’ (MURI) থেকে জাতীয় রেকর্ডের স্বীকৃতি পেয়েছে।

গত ২৭ মে সুরাবায়ার অন্যতম ব্যস্ত এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রে ভেসাক উৎসব বর্ণাঢ্য উৎসবের মধ্য দিয়ে মূর্তিটি উন্মোচন করা হয়। আগামী ৩১ মে পর্যন্ত সুরাবায়ায় এবং পরবর্তীতে ৩ থেকে ৭ জুন দেশটির বৃহত্তম বৌদ্ধ জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজধানী জাকার্তায় এই প্রদর্শনী ও উৎসব চলবে।

ভেসাক উৎসব: ইন্দোনেশিয়ায় ৫.৬ মিটারের স্বচ্ছ বুদ্ধ মূর্তির রেকর্ড

ভেসাক উৎসব: ‘ইন্টারবিয়িং’ দর্শন ও আধুনিক গণসংযোগ

মূর্তিটির নির্মাণশৈলীতে ব্যবহার করা হয়েছে এক বিশেষ ধরনের তারের জাল (wire-mesh)। হাজার হাজার ছোট ছোট গিঁট দিয়ে তৈরি এই স্বচ্ছ অবয়বটির মাধ্যমে প্রয়াত বিশ্বখ্যাত বৌদ্ধ গুরু থিচ নাত হান-এর ‘ইন্টারবিয়িং’ (Interbeing) বা ‘পারস্পরিক আন্তঃসংযোগ’-এর দর্শন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বালির একজন দক্ষ শিল্পী দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে এটি তৈরি করেছেন। এবারের উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— “ইন্টারবিয়িং: আমাদের সুখ, আমাদের যৌথ দায়িত্ব।”

বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এই ধর্মীয় উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ শপিং মলকে বেছে নেওয়ার পেছনে বিশেষ কৌশলগত ও সামাজিক কারণ রয়েছে।

YBAI-এর সংগঠকরা জানান, আধুনিক নগরজীবনে শপিং মল হলো সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক পাবলিক স্পেস, যেখানে ধর্ম, জাতি বা অর্থনৈতিক শ্রেণী নির্বিশেষে সব মানুষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বাধা ছাড়া সহাবস্থান করে। অনেকে হয়তো অন্য ধর্মের উপাসনালয়ে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, কিন্তু মলে সবাই একসঙ্গে যাতায়াত করেন। ফলে মানুষের কাছে শান্তির বার্তা পৌঁছাতে ধর্মকে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের পরিমণ্ডলে নিয়ে আসাই এই আয়োজনের লক্ষ্য।

ভেসাক ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এর ভাইস-চেয়ার ফোর ক্লিয়া আলভিনা এই রেকর্ডের বিষয়ে বলেন: “এই জাতীয় রেকর্ডের উদ্দেশ্য কোনো অহংকার বা সামাজিক প্রতিপত্তি প্রদর্শন নয়। এটি মূলত সাধারণ মানুষের কাছে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সর্বজনীন ও মানবিক মূল্যবোধকে পরিচিত করার একটি আধুনিক মাধ্যম।”

ভেসাক উৎসব: টানা চতুর্থবারের মতো জাতীয় রেকর্ড

YBAI-এর পক্ষ থেকে ভেসাক উৎসবে রেকর্ড গড়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়, বরং এটি তাদের টানা চতুর্থ জাতীয় রেকর্ড। এর আগে সংগঠনটি:

  • ২০২৩ সালে: ১২.৩ মিটার উঁচু দেশের বৃহত্তম ইনডোর বুদ্ধ মূর্তি,
  • ২০২৪ সালে: ৬.৫ মিটারের বৃহত্তম চলমান (moving) বুদ্ধ মূর্তি,
  • ২০২৫ সালে: ৮.৩৪ মিটারের বৃহত্তম ভাসমান বুদ্ধ মূর্তি তৈরি করে রেকর্ড গড়েছিল।

২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত আয়োজিত এই উৎসবটি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় বৌদ্ধ সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং সর্বজনীন নাগাদ প্রকাশে পরিণত হয়েছে।

ভেসাক উৎসব: ইন্দোনেশিয়ায় ৫.৬ মিটারের স্বচ্ছ বুদ্ধ মূর্তির রেকর্ড

মানসিক সংকট নিরসন ও আতিথেয়তার বার্তা

আয়োজক সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে যে, এই প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য কোনো ধর্মান্তরকরণ বা প্রচারণামূলক নয়। প্রাচীন ‘কালাম সুত্ত’ অবলুম্বনে তারা মনে করেন, মানুষ কেবল ঐতিহ্যের খাতিরে নয়, বরং নিজের অভিজ্ঞতায় যা কল্যাণকর তা-ই গ্রহণ করবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মানসিক সংকট—যেমন ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মপরিচয়ের সংকট এবং প্রতিযোগিতার ক্লান্তি—তা নিরসনে বুদ্ধের সচেতনতা (মাইন্ডফুলনেস) ও মোহমুক্তির দর্শন যে কোনো ধর্মের মানুষের জন্যই সমান কার্যকরী হতে পারে।

পাশাপাশি, ভাস্কর্যটির পাশাপাশি উৎসবে একটি ‘থ্রি-ডি (3D) ওয়াক-থ্রু টানেল’ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীরা দৃশ্যমান আলো ও আবহের মাধ্যমে অনুভব করতে পারবেন কীভাবে প্রকৃতি এবং মানবজাতি একে অপরের পরিপূরক।

ইন্দোনেশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় সনাতন (হিন্দু) ধর্মের পর বৌদ্ধধর্ম দ্বিতীয় প্রাচীনতম আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে এখানে শৈলেন্দ্র রাজবংশ ও শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল, যার অন্যতম স্মারক বিশ্ববিখ্যাত বরোবুদুর মন্দির।

বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৭ শতাংশ (প্রায় ২০ লাখ মানুষ) বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, যাদের বেশিরভাগই মহাযান মতবাদের অনুসারী। এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর তরুণ প্রতিনিধিরা এখন আধুনিক রূপকের মাধ্যমে প্রাচীন শান্তি ও সহনশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন বহুজাতিক ইন্দোনেশীয় সমাজে।

আরো পড়ুন>>: ভেসাক উৎসব: ইন্দোনেশিয়ায় ৫.৬ মিটারের স্বচ্ছ বুদ্ধ মূর্তির রেকর্ড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *