ভারতের ওডিশা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি ভাষা অধ্যয়নের জন্য একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ বা উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশটির শিক্ষাবিদ ও বৌদ্ধ অধ্যয়ন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পালি ভাষা অধ্যয়নের স্বতন্ত্র বিভাগ না থাকায় কেন্দ্রটি কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চশিক্ষা বিভাগের অনুমোদনে ধ্রুপদি ভাষাগুলোর গবেষণা ও সংরক্ষণে পাঁচটি উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভাষাগুলো হলো—অসমিয়া, বাংলা, মারাঠি, পালি ও প্রাকৃত।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ধ্রুপদি ভাষাগুলোর ওপর উচ্চতর গবেষণার সুযোগ তৈরি, ভাষাগত ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ডিজিটালাইজেশন এবং সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও গবেষণার বিস্তার ঘটানো।
ওডিশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ওডিশা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদি পালি ভাষার উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অনুমোদন ভারতের বৌদ্ধিক, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত পালি ভাষার অধ্যয়ন, সংরক্ষণ ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার স্থান নির্বাচন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন পালি ভাষা ও বৌদ্ধ অধ্যয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষাবিদ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ–এর প্রতিবেদনে সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সচিব আর. কে. চৌহান বলেন, সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগে থেকেই স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে—এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। অন্যথায় প্রয়োজনীয় একাডেমিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে কেন্দ্রটি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন হতে পারে। তাঁর মতে, ওডিশা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে পালি অধ্যয়নের কোনো স্বতন্ত্র বিভাগ নেই।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমারও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, পালি ভাষা অধ্যয়নের উৎকর্ষ কেন্দ্র ওডিশা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত অনেকটা বিহারে ওড়িয়া ভাষার উৎকর্ষ কেন্দ্র খোলার মতো।
অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার উল্লেখ করেন, পালি ভাষার প্রাচীন নাম ‘মাগধী’, যা ঐতিহাসিক মগধ অঞ্চলের ভাষা। বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্য ঐতিহাসিক মগধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ বিবেচনায় বিহারের নালন্দায় অবস্থিত নবনালন্দা মহাবিহার পালি ভাষা অধ্যয়নের উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য অধিক উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হতে পারত বলে তিনি মত দেন।

তিনি আরও বলেন, আধুনিক যুগে পালি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতিহাসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯০৭ সাল থেকেই সেখানে পালি ভাষার পাঠদান শুরু হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পালি ও বৌদ্ধ অধ্যয়নের জন্য পৃথক দুটি বিভাগও চালু রয়েছে।
পালি ভাষা অধ্যয়নের জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তিনি আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে পালি ভাষা অধ্যয়নের জন্য একাডেমিক বিভাগ বা পাঠদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর পালি ভাষাকে ভারতের ধ্রুপদি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে অসমিয়া, বাংলা, মারাঠি ও প্রাকৃত ভাষাও এ স্বীকৃতি লাভ করে। পালি ভাষার ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে এ সিদ্ধান্তকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়, গবেষক ও ইতিহাসবিদরা স্বাগত জানিয়েছিলেন।
তবে ২০২৪ সালে পালি ভাষাকে ধ্রুপদি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথাযথ একাডেমিক পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটেনি বলে মনে করেন অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার। তাঁর মতে, পালি ভাষার উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আগে ওডিশার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বতন্ত্র পালি বিভাগ চালু করা প্রয়োজন।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে মৌলিক একাডেমিক বিভাগ না রেখে উৎকর্ষ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা অনেকটা মা ছাড়া সন্তানের জন্ম প্রত্যাশা করার মতো।
পালি ভাষা বৌদ্ধ ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য ও প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাহন। এ ভাষায় সংরক্ষিত ত্রিপিটকসহ বৌদ্ধ সাহিত্যের বিশাল ভান্ডার বিশ্বের বৌদ্ধ গবেষণা ও দর্শনচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে পালি ভাষার উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য কার্যকর ও উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সূত্র: Buddhistdoor Global, The Hindu ও The Telegraph।