দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী Seoul-এ অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী লোটাস লণ্ঠন উৎসব এবার প্রযুক্তি ও ধর্মীয় সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বুদ্ধের জন্মোৎসব উপলক্ষে আয়োজিত এই উৎসবে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন, আর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে চারটি মানবাকৃতির রোবট ভিক্ষু। আলোকসজ্জা, রঙিন লণ্ঠন, ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন মিলিয়ে পুরো সিউল যেন রূপ নেয় আলোর নগরীতে।
শনিবার অনুষ্ঠিত তিন ঘণ্টাব্যাপী এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয় প্রায় ২০ হাজার মানুষ এবং ৬০টিরও বেশি সংগঠন। আয়োজকদের তথ্যমতে, দর্শক ও অংশগ্রহণকারী মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এবারের লোটাস লণ্ঠন উৎসব উপভোগ করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
রোবট ভিক্ষুদের উপস্থিতিতে আলোচনায় লোটাস লণ্ঠন উৎসব
এবারের লোটাস লণ্ঠন উৎসব-এর সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল চারটি রোবট ভিক্ষু—গাবি, সোকজা, মোহুই ও নিসা। ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ ভিক্ষুর পোশাক পরে তারা শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। কখনও হাত জোড় করে প্রার্থনার ভঙ্গি, কখনও দর্শকদের দিকে হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা—সব মিলিয়ে রোবট ভিক্ষুরা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

তাদের সঙ্গে ছিল আরও দুটি স্বয়ংক্রিয় চাকার রোবট, যেগুলোতে “Healing” ও “Hope” বার্তা প্রদর্শন করা হয়। প্রযুক্তি ও আধ্যাত্মিকতার এই সমন্বয় দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ প্রজন্মের কাছেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি গাবি নামের একটি রোবট বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে দেশটির গণমাধ্যমে আলোচনায় আসে। এবার সেই রোবটই ঐতিহ্যবাহী লোটাস লণ্ঠন উৎসব-এ অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়ে।
বুদ্ধের জন্মদিন উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী আয়োজন
দক্ষিণ কোরিয়ায় বুদ্ধের জন্মদিন ‘বুচেওনিম ওসিন নাল’ বা “বুদ্ধ আগমনের দিন” নামে পরিচিত এবং এটি সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়। চন্দ্রপঞ্জিকার চতুর্থ মাসের অষ্টম দিনে এ উৎসব উদযাপিত হয়, যা সাধারণত মে মাসে পড়ে। এ বছর আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে ২৪ মে।
কোরিয়ান বৌদ্ধধর্মের প্রধান সংগঠন জগিয়ে অর্ডারের প্রধান ভেনারেবল জিনউ উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেন,
“বুদ্ধের দেখানো সত্যের আলো অনুসরণ করে আমাদের নিজেদের অন্তরে শান্তির প্রদীপ জ্বালাতে হবে এবং পৃথিবীর অন্ধকার দূর করতে সম্প্রীতির আলো ছড়িয়ে দিতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, ধ্যানচর্চার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের জ্ঞান খুঁজে পেতে পারে এবং সেই জ্ঞান সমাজ ও বিশ্বের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারে।
১,২০০ বছরের ইতিহাস বহন করছে লোটাস লণ্ঠন উৎসব
প্রাচীন শিলা রাজবংশ আমল থেকে চলে আসা লোটাস লণ্ঠন উৎসব-এর ইতিহাস ১,২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, নবম শতাব্দীতেই কোরীয় রাজপরিবার এই লণ্ঠন উৎসব উদযাপন করত।
২০২০ সালে UNESCO এই উৎসবকে মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইউনেস্কো জানায়, এই উৎসব শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মানুষকে শান্তি, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বার্তা দেয়।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার ২১টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে কিমচি তৈরির ঐতিহ্য, আরিরাং লোকগান এবং প্যানসোরি সংগীতও উল্লেখযোগ্য।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণে আরও প্রাণবন্ত উৎসব
এ বছরের লোটাস লণ্ঠন উৎসব-এ বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীরাও অংশ নেন। তারা নিজ নিজ দেশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে এবং নিজস্ব নকশার লণ্ঠন বহন করে শোভাযাত্রাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলেন।
বিশেষ করে বাংলাদেশি অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি দক্ষিণ এশীয় দর্শকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। উৎসবজুড়ে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির মিশ্রণে এক আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি হয়।
করোনা মহামারির পর পূর্ণ উদ্দীপনায় ফিরেছে উৎসব
দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় এই লোটাস লণ্ঠন উৎসব প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ দর্শনার্থী আকর্ষণ করে। আধুনিক ইতিহাসে মাত্র চারবার এই উৎসব বাতিল করা হয়েছিল—রাজনৈতিক অস্থিরতা ও করোনা মহামারির কারণে।
২০২০ ও ২০২১ সালে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে উৎসব বন্ধ ছিল। পরে সীমিত পরিসরে আয়োজন করা হলেও এবার আবারও পূর্ণমাত্রায় ফিরে এসেছে ঐতিহ্যবাহী এই আলোর উৎসব।
আয়োজকদের আশা, শান্তি, সহমর্মিতা ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে ভবিষ্যতেও বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবে দক্ষিণ কোরিয়ার লোটাস লণ্ঠন উৎসব।
আরো পড়ুন>>