শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের শান্তি, মৈত্রী ও মানবতার অমল ধবল জ্যোৎস্নায় সিক্ত এক আধ্যাত্মিক মহীরুহ। তিনি বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার প্রজ্ঞার আলো সমাজের অন্ধকার দূর করে মানবতার পথকে আলোকিত করছে। কেবল গেরুয়া বসনধারী একজন ভিক্ষু নন, তিনি শুদ্ধাচার, সমাজ সংস্কার এবং আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত এক কালজয়ী ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ সংগঠন ‘বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা’-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং রামু রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের-এর জন্ম ও শৈশব
এই মহান বৌদ্ধ ভিক্ষু ১৯৮২ সালের ২০ এপ্রিল কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলার কুতুপালং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রবীণ বড়ুয়া এবং মাতা আঙ্কু বালা বড়ুয়া। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু, চিন্তাশীল এবং আধ্যাত্মিক চেতনায় উজ্জীবিত।
শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের-এর প্রব্রজ্যা ও আধ্যাত্মিক সাধনা

কৈশোরেই জাগতিক মোহ ত্যাগ করে তিনি শ্রামণ্যধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন পূজনীয় কুশলায়ন মহাথেরো মহোদয়ের সান্নিধ্যে। উখিয়া শৈলারঢেবা চন্দ্রোদয় বৌদ্ধ বিহারের পবিত্র পরিবেশে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত রচনা করেন। পরবর্তীতে একই গুরুর কাছে উপসম্পদা গ্রহণ করে ভিক্ষুত্বের মহান ব্রতে আত্মনিয়োগ করেন। গুরু-শিষ্যের এই পবিত্র সম্পর্ক তাঁর জীবনে সত্য, ন্যায় ও মানবকল্যাণের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের-এর শিক্ষা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা
তাঁর শিক্ষা জীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি ভারতের কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। পরে থাইল্যান্ডের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে ‘নাকধাম’ সার্টিফিকেট ও ডিপ্লোমা লাভ করেন।
তিনি বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে তিনি মানবসেবার কাজে ব্যবহার করে চলেছেন, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সম্মানিত করেছে।
মানবতার সেবায় শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের স্থাপন করেছেন অসংখ্য দৃষ্টান্ত।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠা
২০২১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘জ্যোতিসেন উচ্চ বিদ্যালয়’ এবং ২০২৪ সালে ‘জ্যোতিসেন মহাথের স্কুল এন্ড কলেজ’। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
বৃদ্ধাশ্রম ও মানবসেবা
২০১৯ সালে তিনি অসহায় প্রবীণদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘মা-বাবা বৃদ্ধাশ্রম’। পাশাপাশি হাসপাতালের রোগীদের নিয়মিত সেবা প্রদান ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর মানবিকতার অনন্য উদাহরণ।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা
একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়েও তিনি ২০১৩ সাল থেকে প্রতি রমজানে অসহায় মুসলিম রোজাদারদের মাঝে ইফতার বিতরণ করে আসছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর জীবনের মূল দর্শন।
স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক অবদান
রামু রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের আধুনিক রূপকার হিসেবে শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের-এর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে:
- রাংকুট জাদুঘর
- পদ্মবীণা ঝুলন্ত ব্রিজ
- ১১৫ ফুট দীর্ঘ ড্রাগন মূর্তি
- দেশের সর্ববৃহৎ ১৫০ ফুট ‘নির্বাণশয্যা’ বুদ্ধবিম্ব (নির্মাণাধীন)
এসব স্থাপনা ধর্মীয় পর্যটন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের-এর সাহিত্য সাধনা
কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের কেবল আধ্যাত্মিক গুরু নন, তিনি একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিকও। তাঁর লেখনীতে ফুটে ওঠে মানবমুক্তি, কর্মফল ও আত্মশুদ্ধির দর্শন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:
- যেমন কর্ম তেমন ফল
- দুঃখ মুক্তির অন্বেষণ
- বিহার তুমি কার
এই গ্রন্থগুলো পাঠকদের নৈতিকতা, আত্মজাগরণ ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করে।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
তাঁর মানবসেবা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অনন্য অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
- ২০২৪ সালে কলকাতায় লাভ করেন ‘মহাত্মা গান্ধী আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার’
- বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভা তাঁকে প্রদান করে ‘সদ্ধর্মভাণক’ উপাধি
- উখিয়ার পাইন্যাশিয়া গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে তিনি লাভ করেন ‘কর্মবীর জ্যোতিসেন’ উপাধি
এসব সম্মাননা তাঁর কর্মময় জীবনের স্বীকৃতি বহন করে।
শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভবিষ্যতে জ্যোতিসেন মহাথের একটি আধুনিক দাতব্য হাসপাতাল, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিশু কল্যাণ আশ্রম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। মানবসেবার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করাই তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত।
শ্রীমৎ কে. শ্রী জ্যোতিসেন মহাথের: মানবতার চিরন্তন আলোকবর্তিকা
জ্যোতিসেন মহাথের কেবল একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব নন; তিনি মানবতা, প্রজ্ঞা ও করুণার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—নিজেকে মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রকৃত সুখ ও আত্মতৃপ্তি।
তাঁর কর্ম, দর্শন ও মানবিকতা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে। শান্তি, মৈত্রী ও মানবতার যে বীজ তিনি বপন করে চলেছেন, তা একদিন বিশ্বকে আরও সুন্দর ও সহনশীল করে তুলবে।
আরো পড়ুন>>