মিয়ানমার বৌদ্ধ ভিক্ষু নির্যাতন: সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

মিয়ানমার বৌদ্ধ ভিক্ষু নির্যাতন নিয়ে আবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন রাজ্যের মোগাউং টাউনশিপে অবস্থিত একটি বৌদ্ধ বিহারের প্রধান ভিক্ষু উ কে থারা (৫৪) সামরিক হেফাজতে আটক ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

স্বাধীন সংবাদমাধ্যম Myanmar Now জানিয়েছে, উ কে থারা প্রায় ৩০ বছর আগে ভিক্ষু হিসেবে দীক্ষা নেন। তিনি তার বিহারকে সামরিক সরকারের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী শান্নি ন্যাশনালিটিজ আর্মি (SNA)-এর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাকে আটক করা হয়।

একটি গণতন্ত্রপন্থী সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, SNA সদস্যরা কয়েকবার বিহারে অবস্থান নেওয়ার অনুমতি চাইলেও ভিক্ষু তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে গভীর রাতে সশস্ত্র সদস্যরা গাড়িবহর নিয়ে এসে বিহারের দরজা ভেঙে তাকে আটক করে নিয়ে যায়।

মিয়ানমার বৌদ্ধ ভিক্ষু নির্যাতন: সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ

মিয়ানমার বৌদ্ধ ভিক্ষু নির্যাতন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমারে রাজনৈতিক সহিংসতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নির্বাচিত সরকারপ্রধান উইন মিন্ট, অং সান সু চি এবং ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (NLD)-এর নেতাদের আটক করে সামরিক বাহিনী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে।

এরপর থেকেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ, দমন-পীড়ন এবং সশস্ত্র সংঘাত চলতে থাকে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় নেতারাও নিরাপদ নন। সাম্প্রতিক মিয়ানমার বৌদ্ধ ভিক্ষু নির্যাতন ঘটনাটি সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

Myanmar Now জানিয়েছে, প্রথমে উ কে থারাকে কাহনিইনমিয়াইং গ্রামের একটি সামরিক ঘাঁটিতে নেওয়া হয়। পরে তাকে মোগাউংয়ের সামরিক অপারেশন কমান্ড-৩ সদর দপ্তরে স্থানান্তর করা হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে জোরপূর্বক ভিক্ষুর পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় এবং শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে SNA সমর্থকদের দাবি, বিহারে তল্লাশির সময় সরকারবিরোধী আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহে ব্যবহৃত “স্প্রিং লটারি” টিকিট ও একটি ওয়াকি-টকি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

উ কে থারার বিরুদ্ধে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি (KIA)-এর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে। যদিও KIA-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, তার সঙ্গে সংগঠনটির কোনো সম্পর্ক নেই। সূত্রটি আরও জানায়, তিনি বরখাস্ত হওয়া NLD সরকারের সমর্থক ছিলেন এবং ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে জনগণকে NLD-কে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে হাজারো মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। চলমান সংঘাতের কারণে দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch গত মার্চে এক বিবৃতিতে জানায়, সামরিক জান্তার দমন-পীড়নে দেশটির সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শিশু সেনা নিয়োগ, ক্লাস্টার বোমা এবং স্থলমাইন ব্যবহারের অভিযোগও বেড়েছে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তাকারী সংগঠন AAPP জানিয়েছে, ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত জান্তার হাতে নিহতের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি, যাদের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি শিশু রয়েছে। এছাড়া ৩১ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মিয়ানমারে থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৪ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির ৯১ শতাংশের বেশি মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাই মিয়ানমার বৌদ্ধ ভিক্ষু নির্যাতন এর মতো ঘটনা দেশটির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আরো পড়ুন>>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *