রাংকূট বনাশ্রম কক্সবাজারের রামু উপজেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক বৌদ্ধ তীর্থস্থান। পাহাড়ঘেরা নীরব পরিবেশ, প্রাচীন বৌদ্ধবিহার, অসংখ্য বুদ্ধমূর্তি এবং সম্রাট অশোককে ঘিরে প্রচলিত ইতিহাসের কারণে স্থানটি দেশ-বিদেশের পর্যটক, গবেষক ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
রাংকূট বনাশ্রম কোথায় এবং কেন বিখ্যাত
কক্সবাজারের রামু চৌমুহনী থেকে দক্ষিণ দিকে এগোলে বাঁকখালী নদীর তীরে দেখা মেলে শিকলঘাটা বেইলি সেতুর। সেতুর কিছু আগেই সড়কের পাশে চোখে পড়ে ঐতিহাসিক রাংকূট বনাশ্রম মহাতীর্থ বিহারের বিশাল প্রবেশদ্বার। শান্ত সবুজ পাহাড় আর ধর্মীয় আবহ মিলিয়ে এটি এখন রামুর অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
জনশ্রুতি ও বিহারে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশের মৌর্য সম্রাট সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পর অহিংসা ও ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে বহু চৈত্য ও স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। রাংকূট বিহারকে সেই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর অন্যতম বলে মনে করা হয়।

সম্রাট অশোক ও রাংকূট বিহারের ইতিহাস
স্থানীয় ভিক্ষুদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দে এই বিহারের প্রতিষ্ঠা হয়। ‘রাং’ শব্দের অর্থ বুদ্ধের বক্ষাস্থি এবং ‘কূট’ অর্থ পাহাড়চূড়া। এই দুটি শব্দ মিলেই ‘রাংকূট’ নামের উৎপত্তি। অনেকের বিশ্বাস, এখানে গৌতম বুদ্ধের পবিত্র বক্ষাস্থি সংরক্ষিত রয়েছে।
আরও জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৮ অব্দে আরাকানের রাজা চন্দ্রজ্যোতি একটি পাথরের বুদ্ধমূর্তির মাথায় বুদ্ধের বক্ষাস্থি সংযোজন করেন। পরবর্তীকালে দীর্ঘ সময় অবহেলায় পড়ে থাকলেও ১৯৩০ সালে ব্রহ্মদেশীয় ভিক্ষু জগৎচন্দ্র মহাথের প্রাচীন পুঁথি ও দলিলের সূত্র ধরে স্থানটি পুনরাবিষ্কার করেন।
রাংকূট মহাবিহারের দর্শনীয় স্থানগুলো
বিহারে প্রবেশের পর দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে পাহাড়ি পথের ধারে সারিবদ্ধ ৮৪টি ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি। ধ্যানমগ্ন পরিবেশের এই অংশটির নাম ‘বুদ্ধনগর’।
এখানে রয়েছে একটি জাদুঘর, যেখানে বিভিন্ন শতকের পুঁথি, শিলালিপি, প্রত্নবস্তু ও বৌদ্ধমূর্তি সংরক্ষিত আছে। বিহার প্রাঙ্গণের বিশাল বটগাছের নিচে স্থাপন করা হয়েছে সম্রাট অশোক ও হিউয়েন সাং–এর ভাস্কর্য।
এ ছাড়া বুদ্ধের প্রথম ধর্মদেশনা, সিদ্ধার্থের জন্মদৃশ্য এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ঘটনার প্রতীকী ভাস্কর্য দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। ড্রাগন গেট পেরিয়ে ৬৭ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে দেখা যায় পাহাড়চূড়ার মূল বৌদ্ধবিহার।

বুদ্ধের বক্ষাস্থি ঘিরে প্রচলিত ইতিহাস
পাহাড়চূড়ার মূল বিহারে স্থাপিত রয়েছে কষ্টিপাথরে নির্মিত একটি প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি। বিহার কর্তৃপক্ষের দাবি, এই মূর্তির সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি সংরক্ষিত রয়েছে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ভিক্ষু, গবেষক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ এখানে আসেন।
ভিক্ষুদের ভাষ্য অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রধান শিষ্য আনন্দকে নিয়ে এই পাহাড়ে বিশ্রাম নিয়েছিলেন এবং ভবিষ্যতে এখানে একটি পবিত্র স্তূপ নির্মিত হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র
বর্তমানে রাংকূট বনাশ্রম শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রও। প্রতিবছর মে মাসে এখানে আয়োজন করা হয় ‘বুদ্ধ বর্ষ বরণ’ উৎসব। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বিদেশি পর্যটকরাও এই উৎসবে অংশ নেন।

বিহারের দর্শনার্থী তালিকা অনুযায়ী, রাশিয়া, চীন, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও গবেষকরা এখানে এসেছেন। বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিও রাংকূটের পরিচিতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে।
রাংকূট বনাশ্রম ভ্রমণের সময়সূচি ও তথ্য
প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য বিহার খোলা থাকে। প্রবেশের জন্য নির্ধারিত টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। টিকিট থেকে প্রাপ্ত অর্থ বিহারের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ব্যয় করা হয়।
পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং প্রাচীন ইতিহাস মিলিয়ে রামুর রাংকূট বনাশ্রম আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ তীর্থ ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
আরো পড়ুন>>: রাংকূট বনাশ্রম: রামুর প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থ ও সম্রাট অশোকের স্মৃতিধন্য বিহার