মিয়ানমারের পাশে কোরীয় বৌদ্ধ এনজিও দ্য প্রমিজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মিয়ানমারে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তায় আবারও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক বৌদ্ধ দুর্যোগ ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সংস্থা দ্য প্রমিজ (ThePromise)। গত ১ থেকে ৫ জুলাই মিয়ানমারের মান্দালয় অঞ্চলে সংস্থাটি চাল, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রীসহ বিভিন্ন জরুরি সহায়তা প্রদান করে।

২০২৫ সালের মার্চে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো। একই সঙ্গে পানি সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

ভূমিকম্পের পরপরই দ্য প্রমিজ ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মান্দালয়, ইনলে ও সাগাইং অঞ্চলে প্রথম দফা জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এরপর একই বছরের জুনে ইনলে ও তাউংগি এলাকায় দ্বিতীয় দফা সহায়তা দেওয়া হয়।

দ্য প্রমিজের চেয়ারম্যান বৌদ্ধ ভিক্ষু ভেন. মিয়োজাং বলেন, দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রভাব শেষ হয়ে যায় না; ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারা পর্যন্ত দুর্যোগের প্রভাব অব্যাহত থাকে। অন্যত্র মানুষের মনোযোগ ও সহায়তা কমে গেলেও প্রয়োজনমতো মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

এবারের কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিও তাবিথা (Tabitha)-এর সহযোগিতায় মান্দালয়ের ৪২০টি পরিবারকে চাল এবং ৬০০ শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী দেওয়া হয়।

এই কার্যক্রমের জন্য দ্য প্রমিজ তাবিথাকে ৬৯ লাখ কোরিয়ান ওন, যা প্রায় ৫ হাজার ১০০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, প্রদান করে। মিয়ানমারের চলমান সংঘাতের কারণে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত নথিবিহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিশেষভাবে এই সহায়তার আওতায় আনা হয়।

সহায়তা পাওয়া ৪২০ পরিবারের মধ্যে অং পিন লাল গ্রামের ২২০টি নথিবিহীন দরিদ্র পরিবার এবং থানলিয়েত মাও গ্রামের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ২০০টি পরিবার রয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ১০ থেকে ১২ কেজি করে মোট ৪ হাজার ৬০০ কেজি চাল দেওয়া হয়।

মান্দালয়ের ২০ বছর ধরে পরিচালিত সুই থা হার স্কুলের ৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী বিতরণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের টুথপেস্ট, টুথব্রাশ ও সাবান দেওয়া হয়েছে।

মঠ পরিচালিত এই স্কুলটিতে মূলত দরিদ্র পরিবারের শিশু, সরকারি স্কুলে পড়ার সুযোগ না পাওয়া শিশু, নথিবিহীন অভিবাসী পরিবারের সন্তান এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে পালিয়ে আসা পরিবারের শিশুরা পড়াশোনা করে।

স্কুলটি মূলত দানের অর্থে পরিচালিত হলেও ভূমিকম্পের পর অর্থায়ন কমে যায়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় একজন ত্রাণকর্মী বলেন, ভূমিকম্পের জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম অনেক আগেই শেষ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে অনেকেই নিজেদের ভুলে যাওয়া মানুষ বলে মনে করছেন এবং হতাশায় ভুগছেন। তাঁর মতে, বস্তুগত সহায়তার পাশাপাশি এই ধরনের উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে এই বার্তাও দেয় যে, তারা এখনও একা নন এবং অন্যরা তাদের পাশে রয়েছেন।

দুর্যোগের পরও মানুষের পাশে দ্য প্রমিজ

দ্য প্রমিজের এবারের কার্যক্রম কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং দীর্ঘদিন পরও যেসব মানুষ সহায়তার বাইরে থেকে গেছেন, তাদের খোঁজ নেওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করাই ছিল কার্যক্রমের অন্যতম লক্ষ্য।

“প্রতিবেশীকে সহায়তা করে অন্যদের সহায়তা করার” মূলমন্ত্র নিয়ে কাজ করে দ্য প্রমিজ। দুর্যোগ মোকাবিলা, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশন এবং আয়বর্ধক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন মানবিক কর্মসূচি পরিচালনা করে সংস্থাটি।

২০১৫ সাল থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবিক সংকট ও দুর্যোগের সময় সহায়তা দিয়ে আসছে দ্য প্রমিজ। দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংজু ও পোহাংয়ের ভূমিকম্প, দেশটির পূর্বাঞ্চলের ২০২২ সালের দাবানল, বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে সংস্থাটি কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হাইতি, মিয়ানমার, সিরিয়া, তুরস্ক, ইউক্রেন ও ভেনেজুয়েলাসহ ২০টিরও বেশি দেশে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বৌদ্ধ ভিক্ষু ভেন. মিয়োজাং ২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দ্য প্রমিজ প্রতিষ্ঠা করেন। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC)-এর বিশেষ পরামর্শক মর্যাদাপ্রাপ্ত সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা ও প্রস্তুতি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

আরো পড়ুন>>: মিয়ানমারের পাশে কোরীয় বৌদ্ধ এনজিও দ্য প্রমিজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *