ইউনেস্কো: ওড়িশার যাজপুর ও কটক জেলায় অবস্থিত তিনটি প্রাচীন বৌদ্ধ প্রত্নস্থল—রত্নগিরি, উদয়গিরি ও ললিতগিরি—নিয়ে গঠিত ‘ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল’ অঞ্চলকে ইউনেস্কো ভারতের টেন্টেটিভ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভারতীয় সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ভবিষ্যতে এই স্থানগুলিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্যই এই তালিকাভুক্তি করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই তিনটি স্থান পূর্ব ভারতের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বৌদ্ধধর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। গবেষকদের ধারণা, এখানেই বৌদ্ধধর্মের তিনটি প্রধান ধারার—থেরবাদ, মহাযান ও বজ্রযান—বিকাশ ও বিস্তারের ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই কারণেই ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গলকে ভারতের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের অন্যতম মূল্যবান অঞ্চল হিসেবে গণ্য করা হয়।

ভারতের পক্ষে বিশ্ব ঐতিহ্য কনভেনশন বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই) প্রায় আট মাস আগে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারে এই অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মনোনয়ন সংক্রান্ত নথিপত্র জমা দেয়। ইউনেস্কোতে ভারতের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি বিশাল ভি. শর্মার মাধ্যমে এই প্রস্তাব পাঠানো হয়। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইউনেস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল সংক্রান্ত মনোনয়ন ভারতের টেন্টেটিভ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য গৃহীত হয়েছে এবং এএসআই জমা দেওয়া নথিপত্র প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী ছিল।
এএসআই-এর পুরী সার্কেলের সুপারিনটেন্ডিং প্রত্নতত্ত্ববিদ ডি. বি. গর্নায়ক জানান, টেন্টেটিভ তালিকায় সেইসব স্থানকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয় যেগুলি সাংস্কৃতিক বা প্রাকৃতিক দিক থেকে ‘অসাধারণ সার্বজনীন মূল্য’ বহন করে এবং ভবিষ্যতে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় স্থান পাওয়ার উপযুক্ত। তাঁর মতে, এই স্বীকৃতি ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গলের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
টেন্টেটিভ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির পর এখন মূল দায়িত্ব ওড়িশা রাজ্য সরকারের ওপর বর্তেছে। গর্নায়ক জানান, পূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য স্বীকৃতি পেতে হলে আরও বিস্তারিত গবেষণা, সংরক্ষণ পরিকল্পনা, প্রত্নস্থল রক্ষার কৌশল এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রচার প্রয়োজন হবে।
ওড়িশার আইনমন্ত্রী পৃথ্বীরাজ হরিচন্দন এই ঘটনাকে রাজ্যের জন্য গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, “ওড়িশার ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল—রত্নগিরি, ললিতগিরি ও উদয়গিরি—ইউনেস্কোর টেন্টেটিভ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি আমাদের রাজ্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য অত্যন্ত গৌরবের।”
মধ্য ওড়িশায় পরস্পরের কাছাকাছি অবস্থিত এই তিনটি প্রত্নস্থল দীর্ঘদিন ধরেই সম্মিলিতভাবে ‘ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিক সমৃদ্ধির কারণেই এই নামকরণ। রত্নগিরির অর্থ ‘মূল্যবান রত্নের পাহাড়’, উদয়গিরির অর্থ ‘উদীয়মান সূর্যের পাহাড়’ এবং ললিতগিরি পরিচিত ‘লাল পাহাড়’ নামে। এই এলাকায় স্তূপ, বৌদ্ধ বিহার, উপাসনাস্থল, শিলালিপি এবং বুদ্ধ ও বিভিন্ন বৌদ্ধ দেবদেবীর অসংখ্য পাথরের মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে।
এই তিনটির মধ্যে রত্নগিরিকে সবচেয়ে বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যাজপুর জেলার কেলুয়া নদীর তীরে আসিয়া পাহাড়শ্রেণিতে প্রায় ৭.২৮ হেক্টর জুড়ে বিস্তৃত এই প্রত্নস্থলে বজ্রযান বৌদ্ধধর্মসংক্রান্ত বহু প্রাচীন বিহার ও উৎকৃষ্ট ভাস্কর্য পাওয়া গেছে, যা এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
বর্তমানে ভারতের মোট ৭০টি স্থান ইউনেস্কোর টেন্টেটিভ তালিকায় রয়েছে, যার মধ্যে সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিক ও মিশ্র শ্রেণির স্থান অন্তর্ভুক্ত। ওড়িশা থেকে ইতিমধ্যেই ভুবনেশ্বরের একাম্র ক্ষেত্র ও গঞ্জাম জেলার চিলিকা হ্রদ এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থিত চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরগুলিকেও টেন্টেটিভ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ওড়িশার দুটি মন্দির রয়েছে।
ভবিষ্যতে যদি ডায়মন্ড ট্রায়াঙ্গল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় চূড়ান্তভাবে স্থান পায়, তবে তা কেবল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিই নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ও বিকাশে ওড়িশার ঐতিহাসিক ভূমিকা নতুন করে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবে।