আষাঢ়ী পূর্ণিমা কেন গুরুত্বপূর্ণ

আষাঢ়ী শব্দটি বাংলা মাসের ৩য় মাসের নাম থেকে নেওয়া। পালিতে এই শব্দবন্ধটিকে ‘আসাল্হ’ বলা হয়। আষাঢ় বা আসাল্হ মাসেই এ পূর্ণিমা প্রবর্তিত হয় বলে এটিকে আষাঢ়ী পূর্ণিমা বলা হয়।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অন্যতম সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বৌদ্ধরা এদিনটিকে সচরাচর শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা হিসেবে অভিহিত করে থাকে।

আজ ১৩ জুলাই, ২০২২ রোজ বুধবার পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন। বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের বৌদ্ধরা যথাযথ ভাবগাম্ভর্যের মাধ্যমে পালন করছে দিনটি। প্রতিটি বিহারে বিহারে পুণ্যর্থীদের আগমনে মুখরিত হয়েছে বিহার প্রঙ্গন।

আষাঢ়ী পূর্ণিমার ইতিহাস

পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই গৌতম বুদ্ধের জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বর্ণিত আছে: এক আষাঢ় মাসের পূর্ণিমায় গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধার্থরূপে মাতৃগর্ভে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। বর্ণিত আছে কপিলাবস্তু নগরে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো।

এক আষাঢ়ী পূর্ণিমায় রাজা শুদ্ধোধনের মহিষী রাণী মহামায়া উপোমথ ব্রত গ্রহণ করলেন। সে রাত্রে রাণী মহামায়া স্বপ্নমগ্না হয়ে দেখলেন যে চার দিক থেকে পাল দেবগণ এসে পালঙ্কসহ তাকে নিয়ে গেল হিমালয়ের পর্বতোপরি এক সমতল ভূমির ওপর। সেখানে মহামায়াকে সুউচ্চ এক মহাশাল বৃক্ষতলে রেখে দেবগণ সশ্রদ্ধ ভঙ্গিমায় এক পাশে অবস্থান দাঁড়িয়ে পড়ল। অত:পর দেবগণের মহিষীরা এসে মায়াদেবীকে হিমালয়ের মানস সরোবরে স্নান করিয়ে দিব্য বসন-ভূষণ ও মাল্যগন্ধে সাজিয়ে দিলেন।

অনতিদূরে একটি শুভ্র রজতপর্বতে ছিল একটি সুবর্ণ প্রাসাদ। চারিদিক থেকে পাল দেবগণ মহারাজা পুনঃপালঙ্কসহ দেবীকে সেই প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে দিব্যশয্যায় শুইয়ে দিল। তখন অদূরবর্তী সুবর্ণ পর্বত থেকে এক শ্বেতহসত্মী নেমে এসে উত্তরদিক থেকে অগ্রসর হয়ে রজতপর্বতে আরোহণ করলেন। রজত শুভ্রশু একটি শ্বেতপদ্মের রূপ পরিগ্রহ করে কবীবর মহাক্রোষ্ণনাদে সুবর্ণ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনবার মাতৃশয্যা প্রদক্ষিণপূর্বক মায়ের শরীরের দক্ষিণ পার্শ্বভেদ করে মাতৃজঠরে প্রবেশ করলেন। পর দিন প্রত্যুষে রাণী মহামায়া রাজা শুদ্ধোধনকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত অবহিত করলেন। কালবিলম্ব না-করে রাজা শুদ্ধোধনকে চৌষট্টিজন জ্যোতির্বিদ এনে স্বপ্নের ফল জানতে চাইলেন। তারা বললেন, “মহারাজ চিন্তা করবেন না, আপনার মহিষী সন্তানসম্ভবা। তিনি এমন এক পুত্ররত্ন লাভ করবেন যার ফলে বসুন্ধরা ধন্য হবে।”

আষাঢ়ী পূর্ণিমা: বর্ষাবাসব্রত ও উপসথ (ক্লিক করুন)

আষাঢ় মাসের আরেক পূর্ণিমা রাতে মাত্র ২৯ বৎসর বয়সে তিনি স্ত্রী-পুত্র-রাজ্য সব মায়া ছেড়ে গৃহত্যাগ করেন। গয়ার বোধিদ্রুম মূলে একাধারে ছয় বছর কঠোর তপস্যার পর এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে পরম জ্ঞান “মহাবোধি” লাভ করেন।

নবলব্ধ ধর্ম প্রকাশের উদ্দেশ্যে তিনি আরেক আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে সারানাথের ঈষিপত্তন মৃগদাবে আগমন করেন। বুদ্ধ এক আষাঢ়ীপূর্ণিমার রাতে ঈষিপত্তন মৃগদাবে সেই পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে প্রথম ধর্মদেশনা “ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র” দেশনা করলেন। কৌণ্ডণ্য, বপ্প, ভদ্দীয়, মহানাম ও অশ্বজিত্—এ পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের কাছে তার নবলব্ধ সদ্ধর্মকে প্রকাশ করেন।

পরে আরো এক আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি মাতৃদেবীকে সদ্ধর্ম দেশনার জন্য তাবৎিংস স্বর্গে গমন করেন। অনুরূপ পূর্ণিমার তিথিতেই বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান গ্রহণ করে।

প্রতিবছর, আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ তিন মাস বর্ষাব্রত পালন করেন। সাধারণ গৃহীরা প্রতি পূর্ণিমা, অষ্টমি এবং অমাবস্যায় অষ্টশীল (৮টি নিয়ম) প্রতিপালন করে। এই আটটি নিয়ম হলো-

অষ্টশীল পালি

১ । পাণাতিপাতা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

২ । অদিন্নাদানা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

৩ । অব্রহ্মচরিযা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

৪ । মুসাবাদা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

৫ । সুরা-মেরয-মজ্জ-পমাদট্ঠানা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

৬ । বিকালভোজনং বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

৭ । নচ্চ-গীত-বাদিত-বিসুকদস্সন মালা-গন্ধ-বিলেপন-ধারণ-মন্ডণ-বিভূসনট্ঠানা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

৮ । উচচ-সযনা মহাসযনা বেরমণী সিক্খাপদং সমাদিযামি।

অষ্টশীল বাংলা

১. প্রাণি হত্যা করবো না।

২. না দেওয়া বস্তু গ্রহণ বা চুরি করবো না।

৩. অব্রহ্মচার্য হবো না।

৪. মিথ্যা কথা বলবো না।

৫. নেশা দ্রব্য পান ও গ্রহণ করবো না।

৬. বিকালে ভোজন করবো না।

৭. নাচ, গান, বাদ্যযন্ত্র শ্রবণ ও ব্যবহার করবো না। মালা, সুগন্ধি দ্রব্য লেপন, ধারণ ও মন্ডণ করবো না।

৮. উচুঁ আসন ও মহা আসনে সয়ন করবো না।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে পরবর্তী তিন মাস অর্থাৎ আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বৌদ্ধগণ প্রতি পূর্ণিমা, অমবস্যা ও অষ্টমি তিথিতে এই নিয়ম গুলো পালন করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমা দিন ভিক্ষুগণ প্রবারণার মাধ্যমে বর্ষাব্রত শেষ করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমা বা প্রবারণা পূর্ণিমা থেকে পরবর্তী এক মাস বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান কঠিন চীবর দানকার্য চলে। যে সব বিহারে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ বর্ষাব্রত পালন করেন কেবল সেই সকল বিহারেই কঠিন চীবর দান করার বিধান রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!