হিন্দু মন্দির নয়, এটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার: ভারতীয় হাইকোর্ট

হিন্দু মন্দিরকে প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির বলে রায় দিয়েছে ভারতীয় হাইকোর্ট। ২০১১ সালে পি. রঙ্গনথের (বর্তমানে মৃত) দায়ের করা মামলায় এমন ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। ভারতের তামিলনাড়ুতে অবস্থিত ধর্মীয় স্থানটি দীর্ঘ দিন হিন্দু মন্দির হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল স্থানীয় হিন্দু জনগুষ্টি।

তামিলনাড়ুর চতুর্থ বৃহত্তম শহর সালেমের থালাভেট্টি মুনিয়াপ্পান মন্দিরের উপর করা একটি প্রত্নতাত্ত্বিক তদন্তে জানা গেছে যে হিন্দুরা যে মূর্তিটি গ্রাম দেবতা হিসাবে পূজা করা হত, তা মূলত বুদ্ধের একটি ভাস্কর্য। ফলস্বরূপ, আদালত তামিলনাড়ু রাজ্যের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে সাইটটির নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং সর্বসাধরণকে প্রাঙ্গনের মধ্যে ধর্মীয় কার্যকলাপ স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে।

বিচারপতি আনন্দ ভেঙ্কটেশ বলেন, “ভাস্কর্যটি পরিদর্শন করে আমাদের হাতে উপলব্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ঐতিহাসিক প্রমাণগুলো যত্ন সহকারে পরীক্ষা করার পর, কমিটি সম্মিলিতভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। কমিটির প্রতিবেদন মতে ভাস্কর্যটিতে বুদ্ধের বেশ কয়েকটি মহালক্ষণ [মহান চিহ্ন] পরিলক্ষিত হয়েছে।”

বিচারক প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে মন্দিরের ভিতরে একটি চিহ্ন স্থাপন করার নির্দেশ দেন যাতে বোঝা যায় যে ভাস্কর্যটি বুদ্ধের। আদালত আরও বলেছে যে জনসাধারণ চাইলে এখনও মন্দিরটি পরিদর্শন করতে পারবে তবে কোনও পূজা বা ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। বিচারপতি আনন্দ ভেঙ্কটেশ সালেমের বুদ্ধ ট্রাস্টের কাছে মন্দিটির জমি পুনরুদ্ধার করে দিতে আঞ্চলিক সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে।

হিন্দু বাঙালি সমাজের বিবর্তণ>>

২০১১ সালে পি. রঙ্গনাথন (বর্তমানে মৃত) বাদী হয়ে আদালতে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। তিনি দাবী করেছিলেন যে, মন্দিরটি অলৌকিকভাবে নিজে নিজেই বুদ্ধের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় বহু বছর ধরে বুদ্ধের মূর্তিটিকে স্থানীয় হিন্দুরা দেবতায় রূপান্তরিত করে পূজা করতে থাকে। 

মাদ্রাজ হাইকোর্ট দ্বার আদিষ্ট হয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ যে প্রতিবেদনটি পেশ করেছে তাতে বলা হয়েছে স্থানটি এবং ভাস্কর্যটি স্পষ্টত বৌদ্ধদের আদি স্থান এবং মুর্তিটি গৌতম বুদ্ধের তাতে কোন সন্দেহ নাই। পরিদর্শনকালে প্রত্নতাত্ত্বিক দলটি বুদ্ধের মহালক্ষণগুলোর প্রতি বিশেষ ফোকাস দিয়েছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ভাস্কর্যটি পরিদর্শন করার পরে আমাদের হাতে উপলব্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণগুলি যত্ন সহকারে পরীক্ষা করার পরে, কমিটি সম্মিলিতভাবে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছে যে ভাস্কর্যটিতে বুদ্ধের বেশ কয়েকটি মহালক্ষণ চিত্রিত হয়েছে।”

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, মূর্তিটি একটি উপবিষ্ট ধ্যানের ভঙ্গিতে অবস্থান করছে যা বৌদ্ধ পরিভাষায় অর্ধ পদ্মাসন নামে পরিচিত।

“মাথায় বুদ্ধের কোঁকড়ানো চুল, একটি উষ্ণিশা [মাথার শীর্ষে একটি ত্রিমাত্রিক ডিম্বাকৃতি] এবং দীর্ঘায়িত কানের লোব। তবে কপালে উর্না (বিন্দু) দৃশ্যমান নয়।”

প্রত্নতাত্ত্বিকরা জানিয়েছেন। “কয়েক বছর আগে মুর্তির মাথাটি ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল পরে তা সিমেন্ট এবং চুনের মিশ্রণ দিয়ে পুনরায় সংযুক্ত করা হয়েছিল। কারিগরদের ত্রুটির কারণে, মাথাটি ধড়ের উপর সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়নি যার ফলে মাথাটি বাম দিকে কিছুটা কাত হয়ে গেছে।”

প্রতিবেদনে যোগ করা হয়েছে, বর্তমানে হিন্দুরা মূর্তিটিকে থালাইভেট্টি মুনিপ্পান দেবতা নামে পূজা করে। তামিল ভাষায় যার অর্থ যার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এমন দেবতা। মুনিপ্পান তামিলনাড়ুতে পরিচিত একটি স্থানীয় দেবতার নাম।”

বিচারপতি আনন্দ ভেঙ্কটেশ ভাস্কর্যটিকে তার আসল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশও দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ভাস্কর্যটিকে থালাইভেট্টি মুনিয়াপ্পান নামে পূজা করা গৌতম বুদ্ধের অপমান করা শামিল। মুর্তিটি আগের আবস্থায় ফিরে আনার জন্য আদালত নির্দেশ দিচ্ছে।”

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দিল্লির মন্ত্রী রাজেন্দ্র পাল গৌতম স্থানীয় মিডিয়া জানিয়েছেন, ”ভারত জুড়ে প্রতিটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় যদি সঠিক তদন্ত করা হয় তবে প্রতিটি সাইট থেকে শুধু বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস বের হয়ে আসবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!